কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড, পুনা চুক্তি, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩২ - ১৯৩৯)
আইন অমান্য আন্দোলনের (১৯৩০–১৯৩১) পরবর্তী অধ্যায়ে ভারতীয় রাজনীতি এক অত্যন্ত সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।
সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা বা কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড (১৯৩২): ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড দ্বারা ঘোষিত পৃথক নির্বাচন নীতি, যা ভারতীয় সমাজকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে।
পুনা চুক্তি (১৯৩২): অস্পৃশ্য/দলিত সম্প্রদায়ের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গান্ধীজির আমরণ অনশন এবং গান্ধী-আম্বেদকরের ঐতিহাসিক সামাজিক সমঝোতা।
ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫: ব্রিটিশ আমলের সবচেয়ে বড় এবং জটিল সাংবিধানিক দলিল, যা স্বাধীন ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯): বিশ্বযুদ্ধের সূচনা এবং ভারতীয়দের মতামত না নিয়ে ভারতে যুদ্ধঘোষণা, যার প্রতিবাদে কংগ্রেসের সকল প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ।
বিস্তারিত আলোচনা (Detailed Analysis)
কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড বা সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা (Communal Award - 1932)
(A) ঘোষণা ও পটভূমি
ঘোষণাকারী: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ⭐ রামসে ম্যাকডোনাল্ড (Ramsay MacDonald)।
তারিখ: ১৬ই আগস্ট, ১৯৩২।
পটভূমি: তিনটি গোলটেবিল বৈঠকের (1930–1932) পর ভারতীয়দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ঐকমত্য না হওয়ার অজুহাতে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
(B) মূল বিষয়বস্তু
মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মতো বিষয়ের পাশাপাশি 'অনগ্রসর প্রজাতি' বা দলিতদের (Depressed Classes) হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা করে তাদের জন্য 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorate) ঘোষণা করা হয়।
(C) প্রতিক্রিয়া
মহাত্মা গান্ধী একে হিন্দু সমাজকে খণ্ড-বিখণ্ড করার ব্রিটিশ চক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেন।
আমরণ অনশন: এর প্রতিবাদে ১৯৩২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর ইয়েরাওয়াডা জেলে (Yeravada Jail, পুনে) গান্ধীজি আমরণ অনশন (Fast unto death) শুরু করেন।
পুনা চুক্তি (Poona Pact - 24th September 1932)
(A) সমঝোতা ও ভূমিকা
গান্ধীজির প্রাণরক্ষায় এবং দলিত ও বর্ণ হিন্দুদের ঐক্য রক্ষায় মধ্যস্থতা করেন পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, সি. রাজাগোপালাচারী এবং পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন।
⭐ চুক্তি স্বাক্ষরকারী: ড. বি. আর. আম্বেদকর (Dr. B.R. Ambedkar) (দলিত শ্রেণীর পক্ষে) এবং পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য (গান্ধীজির পক্ষে/বর্ণ হিন্দুদের পক্ষে)।
স্থান ও তারিখ: ২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩২; পুনের ইয়েরাওয়াডা জেলে।
(B) প্রধান শর্তাবলী ⭐
দলিতদের জন্য 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorates) বাতিল করা হয়।
এর পরিবর্তে প্রাদেশিক আইনসভায় দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসনের (Reserved Seats) সংখ্যা ৭১টি থেকে বাড়িয়ে ১৪৮টি করা হয়।
কেন্দ্রীয় আইনসভায় দলিতদের জন্য ১৮% আসন সংরক্ষিত রাখা হয়।
পরবর্তী প্রভাব: গান্ধীজি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং 'অল ইন্ডিয়া অ্যান্টি-আনটাচেবিলিটি লিগ' ও 'হরিজন' (Harijan) পত্রিকা প্রকাশ করেন।
ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ (Government of India Act, 1935)
এটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ভারতের জন্য দীর্ঘতম আইন ছিল। সাইমন কমিশনের রিপোর্ট, ৩টি গোলটেবিল বৈঠক এবং ১৯৩৩ সালের হোয়াইট পেপারের ওপর ভিত্তি করে আইনটি তৈরি হয়।
(A) প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ ⭐
বিষয় | ১৯৩৫ সালের আইনের বিধান |
সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র (All-India Federation) | কেন্দ্র ও দেশীয় রাজ্যগুলোকে নিয়ে এক অল-ইন্ডিয়া ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব (তবে দেশীয় রাজ্যগুলো যোগ না দেওয়ায় এটি কার্যকর হয়নি)। |
প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (Provincial Autonomy) | ⭐ ১৯১৯ সালের প্রাদেশিক দ্বৈত শাসন (Dyarchy) বাতিল করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চালু হয়। |
কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন (Dyarchy at Centre) | কেন্দ্রে 'সংরক্ষিত' (Reserved) ও 'হস্তান্তরিত' (Transferred) বিষয়ে দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করা হয়। |
ক্ষমতা বন্টন (3 Lists) | ক্ষমতা ৩টি তালিকায় ভাগ হয়: ১. Federal List (৫৯ বিষয়) ২. Provincial List (৫৪ বিষয়) ৩. Concurrent List (৩৬ বিষয়)। অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) ভাইসরয়ের হাতে থাকে। |
যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত (Federal Court) | ১লা অক্টোবর, ১৯৩৭ সালে দিল্লিভিত্তিক Federal Court of India গঠিত হয় (যার প্রথম প্রধান বিচারক ছিলেন স্যার মরিস গয়ার)। |
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা | ১১টি প্রদেশের মধ্যে ৬টি প্রদেশে (বেঙ্গল, বোম্বে, মাদ্রাজ, ইউপি, বিহার, আসাম) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা (Upper & Lower House) চালু হয়। |
বর্মার পৃথকীকরণ | ⭐ ১৯৩৭ সালে বর্মা (মিয়ানমার)-কে ভারত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়। |
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গঠন | দেশের মুদ্রা ও ঋণ নিয়ন্ত্রণের জন্য Reserve Bank of India (RBI) গঠনকে সমর্থন জানানো হয় (১৯৩৫-এ গঠিত)। |
(B) ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন
১৯৩৫ সালের আইনের ভিত্তিতে ১৯৩৭ সালে ১১টি প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
কংগ্রেস ৫টি প্রদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় (মাদ্রাজ, সিপি, ইউপি, বিহার, ওড়িশা) এবং পরবর্তীতে ৮টি প্রদেশে সরকার গঠন করে।
বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি (KPP) ও মুসলিম লীগের যৌথ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং কংগ্রেসের ইস্তফা (Second World War - 1939)
(A) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা
তারিখ: ১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ (জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে যুদ্ধের সূচনা হয়)।
ভারতের অন্তর্ভুক্তি: ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো (Lord Linlithgow) ভারতীয় জনপ্রতিনিধি বা জাতীয় কংগ্রেসের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই ভারতকে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিত্রপক্ষের সহযোগী দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন।
(B) কংগ্রেস মন্ত্রিসভার ইস্তফা (অক্টোবর/নভেম্বর ১৯৩৯)
ভারতীয়দের না জানিয়ে যুদ্ধে টেনে আনার প্রতিবাদে এবং যুদ্ধশেষে স্বাধীন ভারতের সুস্পষ্ট দাবির উত্তর না পেয়ে ১৯৩৯ সালের ২২শে অক্টোবর ৮টি প্রদেশের কংগ্রেস মন্ত্রিসভা একযোগে পদত্যাগ (Resignation) করে।
(C) মুক্তির দিন বা 'Deliverance Day' ⭐
কংগ্রেস মন্ত্রিসভার পদত্যাগে খুশি হয়ে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৯ সালের ২২শে ডিসেম্বর তারিখটিকে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য "মুক্তি দিবস" (Day of Deliverance / Yaum-e-Tanjat) হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। বি. আর. আম্বেদকরও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।
৪. Table: ১৯১৯ বনাম ১৯৩৫ সালের আইনের মূল পার্থক্য
বৈশিষ্ট্য | ১৯১৯ সালের আইন (Mont-Ford) | ১৯৩৫ সালের আইন (GOI Act 1935) |
প্রদেশে শাসন ব্যবস্থা | দ্বৈত শাসন (Dyarchy) চালু ছিল | প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (Autonomy) চালু হয় |
কেন্দ্রে শাসন ব্যবস্থা | কেন্দ্রে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ | কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন (Dyarchy) প্রস্তাবিত |
বিচার ব্যবস্থা | কেন্দ্রীয় কোনো ফেডারেল কোর্ট ছিল না | Federal Court of India গঠিত হয় (1937) |
বর্মার অবস্থান | বর্মা ভারতের অংশ ছিল | বর্মাকে ভারত থেকে পৃথক করা হয় (1937) |
Important Facts (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য) ⭐
⭐ কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড কে ঘোষণা করেন? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড (১৬ আগস্ট, ১৯৩২)।
⭐ পুনা চুক্তি কাদের মধ্যে হয়? মহাত্মা গান্ধী (স্বাক্ষরকারী: মদন মোহন মালব্য) ও ড. বি. আর. আম্বেদকর (২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২)।
⭐ স্বাধীন ভারতের সংবিধানে কোন আইনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি? ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ (Government of India Act, 1935)।
⭐ ১৯৩৫ সালের আইনের মাধ্যমে কোন দেশকে ভারত থেকে আলাদা করা হয়? বর্মা (মিয়ানমার) - ১৯৩৭ সালে।
⭐ ১৯৩৫ সালের আইনে ক্ষমতা বন্টনের অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) কার হাতে ছিল? ভাইসরয় / গভর্নর জেনারেলের হাতে।
⭐ কংগ্রেস মন্ত্রিসভা কত সালে পদত্যাগ করে? ১৯৩৯ সালের অক্টোবর/নভেম্বর মাসে (২য় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে)।
⭐ মুসলিম লীগ কবে 'মুক্তি দিবস' (Day of Deliverance) পালন করে? ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৩৯।
Common Confusion (যে বিষয়গুলো পরীক্ষায় ভুল হয়)
ভুলধারণা 1: পুনা চুক্তিতে গান্ধীজি নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন।
সঠিক তথ্য: জেলে অনশনরত থাকায় গান্ধীজির পক্ষে বর্ণ হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসেবে পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য এবং দলিতদের পক্ষে ড. বি. আর. আম্বেদকর স্বাক্ষর করেন।
ভুলধারণা 2: ১৯৩৫ সালের আইনে প্রদেশে দ্বৈত শাসন চালু করা হয়েছিল।
সঠিক তথ্য: প্রদেশে দ্বৈত শাসন চালু হয়েছিল ১৯১৯ সালের আইনে। ১৯৩৫ সালের আইনে প্রদেশের দ্বৈত শাসন বাতিল করে সেখানে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয় এবং দ্বৈত শাসন কেন্দ্রে প্রস্তাব করা হয়।
ভুলধারণা 3: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) ১৯৩৫ সালের আইনের অধীনে তৈরি হয়।
সঠিক তথ্য: আরবিআই গঠনের প্রস্তাব ছিল এবং এটি RBI Act, 1934 অনুযায়ী ১ম এপ্রিল, ১৯৩৫ সালে গঠিত হয়।
One Minute Revision (Quick Revision Notes)
কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড: ১৬ আগস্ট ১৯৩২ | রামসে ম্যাকডোনাল্ড | দলিতদের পৃথক নির্বাচন ঘোষণা।
পুনা চুক্তি: ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ | ইয়েরাওয়াডা জেল, পুনে | গান্ধী (মালব্য) ও আম্বেদকর | আসন সংখ্যা: ৭১ থেকে বেড়ে ১৪৮।
ভারত শাসন আইন ১৯৩৫: প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চালু | কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন | ৩টি তালিকা (অবশিষ্ট ক্ষমতা ভাইসরয়ের হাতে)।
অন্যান্য সংযোজন (১৯৩৫ আইন): ১৯৩৭-এ বর্মা পৃথক | ১৯৩৭-এ ফেডারেল কোর্ট গঠন।
২য় বিশ্বযুদ্ধ: ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ | ভাইসরয়: লর্ড লিনলিথগো।
কংগ্রেসের পদত্যাগ: ২২ অক্টোবর ১৯৩৯।
মুক্তি দিবস (Deliverance Day): ২২ ডিসেম্বর ১৯৩৯ (জিন্নাহ / মুসলিম লীগ)।
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড, পুনা চুক্তি, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩২ - ১৯৩৯)
আইন অমান্য আন্দোলনের (১৯৩০–১৯৩১) পরবর্তী অধ্যায়ে ভারতীয় রাজনীতি এক অত্যন্ত সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।
সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা বা কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড (১৯৩২): ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড দ্বারা ঘোষিত পৃথক নির্বাচন নীতি, যা ভারতীয় সমাজকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে।
পুনা চুক্তি (১৯৩২): অস্পৃশ্য/দলিত সম্প্রদায়ের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গান্ধীজির আমরণ অনশন এবং গান্ধী-আম্বেদকরের ঐতিহাসিক সামাজিক সমঝোতা।
ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫: ব্রিটিশ আমলের সবচেয়ে বড় এবং জটিল সাংবিধানিক দলিল, যা স্বাধীন ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯): বিশ্বযুদ্ধের সূচনা এবং ভারতীয়দের মতামত না নিয়ে ভারতে যুদ্ধঘোষণা, যার প্রতিবাদে কংগ্রেসের সকল প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ।
বিস্তারিত আলোচনা (Detailed Analysis)
কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড বা সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা (Communal Award - 1932)
(A) ঘোষণা ও পটভূমি
ঘোষণাকারী: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ⭐ রামসে ম্যাকডোনাল্ড (Ramsay MacDonald)।
তারিখ: ১৬ই আগস্ট, ১৯৩২।
পটভূমি: তিনটি গোলটেবিল বৈঠকের (1930–1932) পর ভারতীয়দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ঐকমত্য না হওয়ার অজুহাতে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
(B) মূল বিষয়বস্তু
মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মতো বিষয়ের পাশাপাশি 'অনগ্রসর প্রজাতি' বা দলিতদের (Depressed Classes) হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা করে তাদের জন্য 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorate) ঘোষণা করা হয়।
(C) প্রতিক্রিয়া
মহাত্মা গান্ধী একে হিন্দু সমাজকে খণ্ড-বিখণ্ড করার ব্রিটিশ চক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেন।
আমরণ অনশন: এর প্রতিবাদে ১৯৩২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর ইয়েরাওয়াডা জেলে (Yeravada Jail, পুনে) গান্ধীজি আমরণ অনশন (Fast unto death) শুরু করেন।
পুনা চুক্তি (Poona Pact - 24th September 1932)
(A) সমঝোতা ও ভূমিকা
গান্ধীজির প্রাণরক্ষায় এবং দলিত ও বর্ণ হিন্দুদের ঐক্য রক্ষায় মধ্যস্থতা করেন পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, সি. রাজাগোপালাচারী এবং পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন।
⭐ চুক্তি স্বাক্ষরকারী: ড. বি. আর. আম্বেদকর (Dr. B.R. Ambedkar) (দলিত শ্রেণীর পক্ষে) এবং পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য (গান্ধীজির পক্ষে/বর্ণ হিন্দুদের পক্ষে)।
স্থান ও তারিখ: ২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩২; পুনের ইয়েরাওয়াডা জেলে।
(B) প্রধান শর্তাবলী ⭐
দলিতদের জন্য 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorates) বাতিল করা হয়।
এর পরিবর্তে প্রাদেশিক আইনসভায় দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসনের (Reserved Seats) সংখ্যা ৭১টি থেকে বাড়িয়ে ১৪৮টি করা হয়।
কেন্দ্রীয় আইনসভায় দলিতদের জন্য ১৮% আসন সংরক্ষিত রাখা হয়।
পরবর্তী প্রভাব: গান্ধীজি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং 'অল ইন্ডিয়া অ্যান্টি-আনটাচেবিলিটি লিগ' ও 'হরিজন' (Harijan) পত্রিকা প্রকাশ করেন।
ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ (Government of India Act, 1935)
এটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ভারতের জন্য দীর্ঘতম আইন ছিল। সাইমন কমিশনের রিপোর্ট, ৩টি গোলটেবিল বৈঠক এবং ১৯৩৩ সালের হোয়াইট পেপারের ওপর ভিত্তি করে আইনটি তৈরি হয়।
(A) প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ ⭐
বিষয় | ১৯৩৫ সালের আইনের বিধান |
সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র (All-India Federation) | কেন্দ্র ও দেশীয় রাজ্যগুলোকে নিয়ে এক অল-ইন্ডিয়া ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব (তবে দেশীয় রাজ্যগুলো যোগ না দেওয়ায় এটি কার্যকর হয়নি)। |
প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (Provincial Autonomy) | ⭐ ১৯১৯ সালের প্রাদেশিক দ্বৈত শাসন (Dyarchy) বাতিল করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চালু হয়। |
কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন (Dyarchy at Centre) | কেন্দ্রে 'সংরক্ষিত' (Reserved) ও 'হস্তান্তরিত' (Transferred) বিষয়ে দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করা হয়। |
ক্ষমতা বন্টন (3 Lists) | ক্ষমতা ৩টি তালিকায় ভাগ হয়: ১. Federal List (৫৯ বিষয়) ২. Provincial List (৫৪ বিষয়) ৩. Concurrent List (৩৬ বিষয়)। অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) ভাইসরয়ের হাতে থাকে। |
যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত (Federal Court) | ১লা অক্টোবর, ১৯৩৭ সালে দিল্লিভিত্তিক Federal Court of India গঠিত হয় (যার প্রথম প্রধান বিচারক ছিলেন স্যার মরিস গয়ার)। |
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা | ১১টি প্রদেশের মধ্যে ৬টি প্রদেশে (বেঙ্গল, বোম্বে, মাদ্রাজ, ইউপি, বিহার, আসাম) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা (Upper & Lower House) চালু হয়। |
বর্মার পৃথকীকরণ | ⭐ ১৯৩৭ সালে বর্মা (মিয়ানমার)-কে ভারত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়। |
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গঠন | দেশের মুদ্রা ও ঋণ নিয়ন্ত্রণের জন্য Reserve Bank of India (RBI) গঠনকে সমর্থন জানানো হয় (১৯৩৫-এ গঠিত)। |
(B) ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন
১৯৩৫ সালের আইনের ভিত্তিতে ১৯৩৭ সালে ১১টি প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
কংগ্রেস ৫টি প্রদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় (মাদ্রাজ, সিপি, ইউপি, বিহার, ওড়িশা) এবং পরবর্তীতে ৮টি প্রদেশে সরকার গঠন করে।
বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি (KPP) ও মুসলিম লীগের যৌথ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং কংগ্রেসের ইস্তফা (Second World War - 1939)
(A) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা
তারিখ: ১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ (জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে যুদ্ধের সূচনা হয়)।
ভারতের অন্তর্ভুক্তি: ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো (Lord Linlithgow) ভারতীয় জনপ্রতিনিধি বা জাতীয় কংগ্রেসের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই ভারতকে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিত্রপক্ষের সহযোগী দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন।
(B) কংগ্রেস মন্ত্রিসভার ইস্তফা (অক্টোবর/নভেম্বর ১৯৩৯)
ভারতীয়দের না জানিয়ে যুদ্ধে টেনে আনার প্রতিবাদে এবং যুদ্ধশেষে স্বাধীন ভারতের সুস্পষ্ট দাবির উত্তর না পেয়ে ১৯৩৯ সালের ২২শে অক্টোবর ৮টি প্রদেশের কংগ্রেস মন্ত্রিসভা একযোগে পদত্যাগ (Resignation) করে।
(C) মুক্তির দিন বা 'Deliverance Day' ⭐
কংগ্রেস মন্ত্রিসভার পদত্যাগে খুশি হয়ে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৯ সালের ২২শে ডিসেম্বর তারিখটিকে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য "মুক্তি দিবস" (Day of Deliverance / Yaum-e-Tanjat) হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। বি. আর. আম্বেদকরও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।
৪. Table: ১৯১৯ বনাম ১৯৩৫ সালের আইনের মূল পার্থক্য
বৈশিষ্ট্য | ১৯১৯ সালের আইন (Mont-Ford) | ১৯৩৫ সালের আইন (GOI Act 1935) |
প্রদেশে শাসন ব্যবস্থা | দ্বৈত শাসন (Dyarchy) চালু ছিল | প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (Autonomy) চালু হয় |
কেন্দ্রে শাসন ব্যবস্থা | কেন্দ্রে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ | কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন (Dyarchy) প্রস্তাবিত |
বিচার ব্যবস্থা | কেন্দ্রীয় কোনো ফেডারেল কোর্ট ছিল না | Federal Court of India গঠিত হয় (1937) |
বর্মার অবস্থান | বর্মা ভারতের অংশ ছিল | বর্মাকে ভারত থেকে পৃথক করা হয় (1937) |
Important Facts (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য) ⭐
⭐ কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড কে ঘোষণা করেন? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড (১৬ আগস্ট, ১৯৩২)।
⭐ পুনা চুক্তি কাদের মধ্যে হয়? মহাত্মা গান্ধী (স্বাক্ষরকারী: মদন মোহন মালব্য) ও ড. বি. আর. আম্বেদকর (২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২)।
⭐ স্বাধীন ভারতের সংবিধানে কোন আইনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি? ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ (Government of India Act, 1935)।
⭐ ১৯৩৫ সালের আইনের মাধ্যমে কোন দেশকে ভারত থেকে আলাদা করা হয়? বর্মা (মিয়ানমার) - ১৯৩৭ সালে।
⭐ ১৯৩৫ সালের আইনে ক্ষমতা বন্টনের অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) কার হাতে ছিল? ভাইসরয় / গভর্নর জেনারেলের হাতে।
⭐ কংগ্রেস মন্ত্রিসভা কত সালে পদত্যাগ করে? ১৯৩৯ সালের অক্টোবর/নভেম্বর মাসে (২য় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে)।
⭐ মুসলিম লীগ কবে 'মুক্তি দিবস' (Day of Deliverance) পালন করে? ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৩৯।
Common Confusion (যে বিষয়গুলো পরীক্ষায় ভুল হয়)
ভুলধারণা 1: পুনা চুক্তিতে গান্ধীজি নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন।
সঠিক তথ্য: জেলে অনশনরত থাকায় গান্ধীজির পক্ষে বর্ণ হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসেবে পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য এবং দলিতদের পক্ষে ড. বি. আর. আম্বেদকর স্বাক্ষর করেন।
ভুলধারণা 2: ১৯৩৫ সালের আইনে প্রদেশে দ্বৈত শাসন চালু করা হয়েছিল।
সঠিক তথ্য: প্রদেশে দ্বৈত শাসন চালু হয়েছিল ১৯১৯ সালের আইনে। ১৯৩৫ সালের আইনে প্রদেশের দ্বৈত শাসন বাতিল করে সেখানে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয় এবং দ্বৈত শাসন কেন্দ্রে প্রস্তাব করা হয়।
ভুলধারণা 3: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) ১৯৩৫ সালের আইনের অধীনে তৈরি হয়।
সঠিক তথ্য: আরবিআই গঠনের প্রস্তাব ছিল এবং এটি RBI Act, 1934 অনুযায়ী ১ম এপ্রিল, ১৯৩৫ সালে গঠিত হয়।
One Minute Revision (Quick Revision Notes)
কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড: ১৬ আগস্ট ১৯৩২ | রামসে ম্যাকডোনাল্ড | দলিতদের পৃথক নির্বাচন ঘোষণা।
পুনা চুক্তি: ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ | ইয়েরাওয়াডা জেল, পুনে | গান্ধী (মালব্য) ও আম্বেদকর | আসন সংখ্যা: ৭১ থেকে বেড়ে ১৪৮।
ভারত শাসন আইন ১৯৩৫: প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চালু | কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন | ৩টি তালিকা (অবশিষ্ট ক্ষমতা ভাইসরয়ের হাতে)।
অন্যান্য সংযোজন (১৯৩৫ আইন): ১৯৩৭-এ বর্মা পৃথক | ১৯৩৭-এ ফেডারেল কোর্ট গঠন।
২য় বিশ্বযুদ্ধ: ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ | ভাইসরয়: লর্ড লিনলিথগো।
কংগ্রেসের পদত্যাগ: ২২ অক্টোবর ১৯৩৯।
মুক্তি দিবস (Deliverance Day): ২২ ডিসেম্বর ১৯৩৯ (জিন্নাহ / মুসলিম লীগ)।