১. প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের পটভূমি (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক)
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় সমাজে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে যে অস্থিরতা দেখা যায়, তা জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের মূল কারণ।
মূল পটভূমি:
ধর্মীয় জটিলতা: ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জটিল যজ্ঞকর্ম, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে পালন করা কঠিন ছিল।
অর্থনৈতিক অপচয়: যজ্ঞে জীবহিংসা ও অতিরিক্ত অর্থব্যয়, যা কৃষিভিত্তিক সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
সামাজিক বৈষম্য: কঠোর বর্ণব্যবস্থা, যেখানে শূদ্র ও নিচুতলার মানুষ বঞ্চিত ছিল।
দার্শনিক অসঙ্গতি: উপনিষদীয় তত্ত্ব ছিল জটিল এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না।
নবীন শ্রেণীর আকাঙ্ক্ষা: নগর ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট বণিক শ্রেণী (বৈশ্য) সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করত। জৈন ধর্মে অহিংসার কারণে বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
ফলাফল: যজ্ঞ, বর্ণব্যবস্থা ও ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানবিক ও সমতাভিত্তিক আদর্শ নিয়ে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম আত্মপ্রকাশ করে।
২. জৈন ধর্মের উত্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্য
জৈন ধর্মের উত্থান ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রধানত বিহারের মগধ অঞ্চলে। এই ধর্মটি প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যমান, তবে এটি ২৪ জন তীর্থঙ্করের ধারাবাহিকতায় বিকশিত হয়েছে।
তীর্থঙ্কর: জৈন ধর্মের মহান শিক্ষাগুরু বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। এঁরা সংসার ত্যাগ করে 'কেবল জ্ঞান' বা 'কেবল্য' লাভ করেন।
প্রথম তীর্থঙ্কর: ঋষভনাথ বা আদিনাথ।
২৩তম তীর্থঙ্কর: পার্শ্বনাথ। ইনি চতুর্মহব্রত (অহিংসা, সত্য, অচৌর্য, অপরিগ্রহ) প্রচার করেন।
২৪তম (শেষ) তীর্থঙ্কর: মহাবীর (বর্ধমান) — সর্বাধিক প্রভাবশালী।
উত্থানের কারণ:
সমাজে অহিংসার আকাঙ্ক্ষা।
তপস্যা ও নৈতিকতার উপর চরম গুরুত্ব।
সহজ ভাষায় ধর্মচর্চা (অর্ধমাগধী প্রাকৃত)।
বর্ণভেদবিরোধী মানবিক ধর্ম।
৩. মহাবীর: জন্ম, কেবল্য লাভ ও দেহত্যাগ
জৈন ধর্মের প্রচার ও প্রসার মহাবীরের জীবন ও শিক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
ক) জন্ম ও বংশ পরিচয়
বিবরণ | তথ্য |
পূর্ণ নাম | বর্ধমান মহাবীর (Vardhamana Mahavira) |
জন্ম | খ্রিস্টপূর্ব ৫৪০ অব্দ |
জন্মস্থান | কুণ্ডলগ্ৰাম (বর্তমান বিহারের বৈশালীর কাছে) |
পিতা | সিদ্ধার্থ — জ্ঞানত্রিক কুলের প্রধান |
মাতা | ত্রিশলা — লিচ্ছবি গণরাজ্যের প্রধান চেতকের ভগিনী |
স্ত্রী | যশোধা |
কন্যা | প্রিয়দর্শনা (অনোজ্জা) |
গৃহত্যাগ: ৩০ বছর বয়সে সত্যের সন্ধানে বিলাসী জীবন পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন। ঘটনাটি মহাবিনিষ্ক্রমণ-এর অনুরূপ।
খ) দিব্য জ্ঞান লাভ (কেবল্য)
কঠোর তপস্যা: মহাবীর ১২ বছর কঠোর তপস্যা করেন।
কেবল্য লাভ: ৪২ বছর বয়সে জৃম্ভিকাগ্রামে, ঋজুপালিকা নদীর তীরে শাল গাছের নিচে।
উপাধি: জ্ঞানপ্রাপ্তির পর তিনি কেবলি (সর্বজ্ঞ), জিন (বিজয়ী) এবং মহাবীর (শ্রেষ্ঠ বীর) নামে পরিচিত হন।
গ) ধর্মপ্রচার ও দেহত্যাগ
প্রচার কাল ও ভাষা: জীবনের শেষ ৩০ বছর ধর্মপ্রচার করেন। ভাষা ব্যবহার করেন অর্ধমাগধী প্রাকৃত (সাধারণ মানুষের বোধগম্য)।
দেহত্যাগ: খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৮ অব্দে পাবাপুরী (বিহার) নামক স্থানে, ৭২ বছর বয়সে। ঘটনাটি জৈন মতে মহাপরিনির্বাণ-এর সমতুল্য।
৪. মহাবীরের ধর্মনীতি ও দর্শন
ক) ত্রিরত্ন (Three Jewels)
জৈন ধর্মের মূল দর্শন হলো এই তিনটি সঠিক পথ অনুসরণ করা:
1. সম্যক দর্শন (Right Faith): জৈন তীর্থঙ্করদের প্রতি সঠিক উপলব্ধি এবং বিশ্বাস।
2. সম্যক জ্ঞান (Right Knowledge): জৈন মতবাদ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন।
3. সম্যক চরিত্র (Right Conduct): পঞ্চমহাব্রত পালনের মাধ্যমে সঠিক আচরণ করা।
খ) পঞ্চমহাব্রত (Five Great Vows)
মহাবীর ২৩তম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের প্রচারিত চতুর্মহাব্রতের সঙ্গে ব্রহ্মচর্য যোগ করে এটিকে পঞ্চমহাব্রতে রূপ দেন।
1. অহিংসা (Ahimsa): কোনো প্রাণীকে ক্ষতি না করা (জৈন ধর্মে অহিংসা চরম পর্যায়ে)।
2. সত্য (Satya): সর্বদা সত্য ভাষণ করা।
3. অচৌর্য (Asteya): চুরি না করা (এমনকি অনুমতি ছাড়া কিছু গ্রহণ না করা)।
4. ব্রহ্মচর্য (Brahmacharya): ইন্দ্রিয়সংযম (মহাবীরের সংযোজন)।
5. অপরিগ্রহ (Aparigraha): সম্পদে আসক্তি ত্যাগ এবং সঞ্চয় না করা।
গ) দার্শনিক তত্ত্ব
অন্যকান্তবাদ (Anekantavada): এটি হলো সত্যের বহু দৃষ্টিভঙ্গি-র তত্ত্ব। সত্য বা জ্ঞান একক ও চরম নয়, বরং আপেক্ষিক ও বহুমাত্রিক (যেমন, হস্তী ও অন্ধদের উপমা)।
সয়াদবাদ (Syadvada): এটি হলো অন্যকান্তবাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকাশ বা আপেক্ষিকতা। এর অর্থ 'হতে পারে' বা 'কোনো দিক থেকে'। কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়, এটি সাতটি মাত্রায় প্রকাশ করা যায় (সপ্তভঙ্গীনয়)।
কর্ম ও পুনর্জন্ম: জৈন ধর্ম কর্মফলের উপর চরম গুরুত্ব দেয়। কর্মের ফলই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে এবং জৈনদের লক্ষ্য হলো কর্মের ফল থেকে মুক্ত হওয়া (নির্বাণ/মোক্ষ)।
৫. জৈন ধর্মের বিভাজন ও সংগীতি
ক) বিভাজনের কারণ
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মগধে ১২ বছরব্যাপী দুর্ভিক্ষ হলে জৈনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়:
1. ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে একদল সন্ন্যাসী দক্ষিণে (শ্রবণবেলগোলা) চলে যান।
2. স্থূলভদ্রের নেতৃত্বে অন্য দলটি মগধেই থেকে যান।
খ) দুটি সম্প্রদায়
সম্প্রদায় | দিগম্বর (Digambara - Sky-clad) | শ্বেতাম্বর (Shvetambara - White-clad) |
অর্থ | বস্ত্রপরিত্যাগী (দিকই যার অম্বর বা বস্ত্র) | সাদা বস্ত্র পরিধানকারী |
নেতা | ভদ্রবাহুর অনুগামী | স্থূলভদ্রের অনুগামী |
মুক্তির শর্ত | নারী মুক্তির সম্ভাবনা অস্বীকার; নগ্নতা আবশ্যক। | নারীর মুক্তি স্বীকার; নগ্নতা আবশ্যক নয়। |
তপস্যা | গুরুতর ও কঠোর তপস্যাপরায়ণ। | তুলনামূলক সহজ ও শিথিল তপস্যা। |
আগম সাহিত্য | আগম সাহিত্য গ্রহণ করে না। | আগম সাহিত্য গ্রহণ করে। |
গ) জৈন সংগীতি (Jain Councils)
সংগীতি | সময় | স্থান | সভাপতি | তাৎপর্য |
প্রথম | খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক | পাটলিপুত্র | স্থূলভদ্র | জৈন ধর্ম দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর— এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়। |
দ্বিতীয় | খ্রিস্টীয় ৫ম শতক (৪৫৩/৪৬৬) | বল্লভী (গুজরাট) | দেবার্ধি ক্ষেমশর্মণ। | আগম সাহিত্যকে চূড়ান্তভাবে সংকলিত করা হয়। |
৬. জৈন সাহিত্য, অনুগামী ও স্থাপত্য
ক) জৈন সাহিত্য
প্রধান গ্রন্থ: জৈন ধর্মের প্রধান গ্রন্থসমূহকে বলা হয় আগম (Agamas)।
ভাষা: অর্ধমাগধী প্রাকৃত (প্রাথমিক), পালি ও সংস্কৃত।
উল্লেখযোগ্য রচনা:
কল্পসূত্র : ভদ্রবাহু রচিত, মহাবীর ও অন্যান্য তীর্থঙ্করদের জীবনী।
তত্ত্বার্থসূত্র: উমাস্বাতি রচিত, জৈন দর্শনের একটি সংকলন।
খ) অনুগামী ও পৃষ্ঠপোষক
পৃষ্ঠপোষক রাজা:
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য: জীবনের শেষে জৈন সন্ন্যাস গ্রহণ করে ভদ্রবাহুর সঙ্গে দক্ষিণে (শ্রবণবেলগোলা) যান।
খারবেল: কলিঙ্গের শক্তিশালী রাজা, যিনি জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
গঙ্গ বংশ ও রাষ্ট্রকূট বংশের রাজারাও পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
গ) জৈন স্থাপত্য
দিলওয়াড়া মন্দির: মাউন্ট আবু, রাজস্থান। এটি মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
গোমটেশ্বর/বহুবলী মূর্তি: শ্রবণবেলগোলা, কর্ণাটক। এটি একটি বিশাল আকারের মনোলিথ (একশিলা) মূর্তি।
পাবাপুরী জলমন্দির: বিহার, মহাবীরের মহাপরিনির্বাণের স্থান।
রণকপুর জৈন মন্দির, রাজস্থান এবং গিরনার পাহাড়ের মন্দিরসমূহ।
🌟 বৌদ্ধ ধর্ম —
১. প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের পটভূমি (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক)
এই সময়কালে ভারতের সমাজে ধর্মীয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়।
মূল কারণ:
ধর্মীয় জটিলতা: যজ্ঞকেন্দ্রিক জটিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিস্তার।
অর্থনৈতিক বোঝা: যজ্ঞে জীবহিংসা ও অতিরিক্ত অর্থব্যয়।
সামাজিক বৈষম্য: কঠোর বর্ণব্যবস্থা এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রেণীশোষণ।
দার্শনিক শূন্যতা: দার্শনিক উপনিষদীয় তত্ত্ব সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না।
শ্রেণী অবদমন: কৃষক, শ্রেণী-মধ্যবিত্ত ও বণিক শ্রেণীর সামাজিক অবদমন।
ফলাফল: এই পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ ধর্ম অবৈদিক, মানবিক, সমতামূলক প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
২. বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান ও কারণ
বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটে প্রধানত মগধ ও কোশল অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে।
উত্থানের কারণ:
জটিল যজ্ঞের বিরোধিতা।
কৃষক ও সমাজের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
অহিংসা, সমতা ও যুক্তিবাদী দর্শনের প্রয়োগ।
সহজ ভাষায় ধর্মব্যাখ্যা (পালি ভাষা)।
৩. গৌতম বুদ্ধ: জন্ম ও বংশপরিচয়
বিবরণ | তথ্য |
জন্মনাম | সিদ্ধার্থ গৌতম (Siddhartha Gautama) |
জন্মস্থান | লুম্বিনী উদ্যান, কপিলাবস্তু (বর্তমান নেপাল) |
জন্ম তারিখ | খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দ |
বংশ | শাক্য গণরাজ্যের ক্ষত্রিয় বংশ (এজন্য তিনি শাক্যমুনি নামেও পরিচিত) |
পিতা | শুদ্ধোধন — শাক্য গণরাজ্যের প্রধান |
মাতা | মায়াদেবী (মৃত্যু হয় জন্মের ৭ দিন পর) |
বিমাতা | মহাপ্রজাপতি গৌতমী |
স্ত্রী | যশোধরা |
পুত্র | রাহুল |
অন্যান্য উপাধি | তথাগত (যিনি সত্য লাভ করেছেন) |
শৈশব ও যৌবন: সামরিক ও শাস্ত্রীয় শিক্ষায় পারদর্শী এবং বিলাসী জীবন যাপন করতেন।
পরিবর্তন: বিলাসী জীবন পরিত্যাগের পূর্বে "চার দর্শন"— বার্ধক্য, রোগ, মৃত্যু, সন্ন্যাসী— তাঁকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করে।
৪. বোধিলাভ (দিব্যজ্ঞান লাভ)
গৃহত্যাগ: ২৯ বছর বয়সে, ঘটনাটি মহাবিনিষ্ক্রমণ নামে পরিচিত।
তপস্যা: কঠোর তপস্যা শেষে উপলব্ধি— কঠোর তপস্যা নয়, প্রয়োজন মধ্যমার্গ।
বোধিলাভ: বোধগয়া, নীরঞ্জনা নদীর (ফাল্গু নদী) তীরে।
বয়স: ৩৫ বছর।
নাম পরিবর্তন: বোধিলাভের পর তিনি পরিচিত হন “বুদ্ধ” (The Enlightened One) নামে।
বোধিবৃক্ষ: পিপুল বা অশ্বত্থ গাছ (যা মহাবোধি বৃক্ষ নামে পরিচিত)।
৫. বৌদ্ধ ধর্মপ্রচার ও মহাপরিনির্বাণ
প্রথম ধর্মপ্রবর্তন: সারনাথ, মৃগদাব অরণ্যে (বারাণসীর কাছে) পাঁচজন শিষ্যের কাছে।
এটিকে বলা হয় ধর্মচক্র প্রবর্তন (Dharmachakra Pravartana)।
প্রতীক: চক্র বা চাকা।
প্রচারকাল ও ভাষা: ৪৫ বছর ধরে উত্তর ভারত জুড়ে ধর্মপ্রচার করেন। প্রচারের ভাষা ছিল পালি, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য।
প্রচারপদ্ধতি: উপদেশ (ধর্মদেশনা) প্রদান এবং সংঘজীবন প্রতিষ্ঠা।
মহাপরিনির্বাণ (দেহত্যাগ):
মৃত্যু: কুশীনগর, মল্ল রাজ্যের অন্তর্গত।
বয়স: ৮০ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৩ অব্দ, বা প্রচলিত মতে ৪৮৩ অব্দ)।
ঘটনাটি পরিচিত: মহাপরিনির্বাণ নামে।
প্রতীক: স্তূপ।
৬. বৌদ্ধ ধর্মের মূল আদর্শ ও দর্শন
ক) ত্রি-রত্ন (The Three Jewels)
বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি তিনটি—
1. বুদ্ধ (বুদ্ধত্ব অর্জন)
2. ধর্ম (বুদ্ধের শিক্ষা)
3. সংঘ (ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের সম্প্রদায়)
খ) চার আর্যসত্য (Four Noble Truths)
1. দুঃখ: জীবন দুঃখময়।
2. দুঃখ সমুদয়: দুঃখের কারণ হলো তৃষ্ণা বা কামনা।
3. দুঃখ নিরোধ: তৃষ্ণা বা কামনা নাশে দুঃখ নাশ করা সম্ভব।
4. দুঃখ নিরোধগামী প্রতিপদা (অষ্টাঙ্গিক মার্গ): দুঃখনাশের পথ হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ।
গ) অষ্টাঙ্গিক মার্গ (Eightfold Path)
দুঃখ নিবারণের জন্য আটটি সঠিক পথ—
বিভাগ | মার্গ | বিবরণ |
প্রজ্ঞা | ১. সম্যক দৃষ্টি (সঠিক জ্ঞান) | ২. সম্যক সংকল্প (সঠিক উদ্দেশ্য) |
শীল | ৩. সম্যক বাক (সঠিক কথা) | ৪. সম্যক কর্মান্ত (সঠিক কাজ) |
৫. সম্যক আজীবিকা (সঠিক জীবনযাত্রা/উপার্জন) | ||
সমাধি | ৬. সম্যক ব্যায়াম (সঠিক প্রচেষ্টা) | ৭. সম্যক স্মৃতি (সঠিক সচেতনতা) |
৮. সম্যক সমাধি (সঠিক ধ্যান) |
ঘ) অন্যান্য দর্শন
মধ্যমার্গ (Middle Path): না কঠোর তপস্যা, না বিলাসী জীবন — জীবনে ভারসাম্য।
অহিংসা: সকল প্রাণীর প্রতি সমান সহানুভূতি।
অনিত্য: সবকিছুই পরিবর্তনশীল; কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
অনাত্মবাদ: স্থায়ী কোনো ‘আত্মা’ নেই, কিন্তু কর্মের ধারাবাহিকতা নতুন জীবন সৃষ্টি করে (কর্মফল বা কর্ম)।
৭. বৌদ্ধদের সম্মেলন (বৌদ্ধ সংগীতি)
বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্মের নীতি ও আদর্শ আলোচনার জন্য চারটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংগীতি | সময় | স্থান | সভাপতি | পৃষ্ঠপোষক রাজা | তাৎপর্য |
প্রথম | ৪৪৩ বা ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্ব | রাজগৃহ (সপ্তপর্ণী গুহা) | মহাকাশ্যপ | অজাতশত্রু (হর্যঙ্ক) | বিনয় পিটক ও সূত্র পিটক সংকলন। |
দ্বিতীয় | ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্ব | বৈশালী | সবকামী বা সল্হ | কালাশোক (শিশুননাগ) | বিনয় পিটক সংক্রান্ত মতভেদ; সংঘের স্থবির ও মহাসাংঘিক গোষ্ঠীতে বিভাজন। |
তৃতীয় | ২৫০ খ্রিস্টপূর্ব | পাটলীপুত্র | মোগ্গলিপুত্ত তিষ্য | অশোক (মৌর্য) | অভিধর্ম পিটক সংকলন। |
চতুর্থ | খ্রিস্টীয় প্রথম শতক | কাশ্মীরের কুন্দলবন | বসুমিত্র ও অশ্বঘোষ | কণিষ্ক (কুষাণ) | বৌদ্ধ ধর্ম হীনযান ও মহাযান— এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়। |
৮. বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান সম্প্রদায় (বিভাজন)
মৌলিকভাবে বৌদ্ধ ধর্ম চারটি প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত—
সম্প্রদায় | মূল আদর্শ | ভাষা | বৈশিষ্ট্য |
১. হীনযান (Hinayana) | ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জন। | পালি | বুদ্ধকে সাধারণ মানুষ মনে করে; সংযমবাদ, থেরবাদ নামেও পরিচিত। |
২. মহাযান (Mahayana) | সর্বজনীন মুক্তি (সকলের নির্বাণ)। | সংস্কৃত | বুদ্ধকে ঈশ্বরতুল্য সম্মান (বোধিসত্ত্বের ধারণা), মূর্তি পূজা। |
৩. বজ্রযান (Vajrayana) | তান্ত্রিক প্রভাব ও মন্ত্র-তন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত নির্বাণ। | সংস্কৃত/তিব্বতি | তিব্বত, ভুটান, নেপালে জনপ্রিয়। |
৪. থেরবাদ (Theravada) | হীনযানের প্রাচীনতম রূপ, বর্তমানে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডে প্রচলিত। | পালি | প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিশ্বাসী। |
৯. বৌদ্ধ সাহিত্য
বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো ত্রিপিটক (তিনটি ঝুড়ি)।
পিটক | বিষয়বস্তু |
১. বিনয় পিটক | ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের আচরণবিধি ও নিয়মাবলী। |
২. সুত্র পিটক | বুদ্ধের উপদেশ ও কথোপকথনসমূহ (পাঁচটি নিকায় বিভক্ত)। |
৩. অভিধর্ম পিটক | ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ। |
ভাষা: ত্রিপিটকের মূল ভাষা হলো পালি (যা হীনযানের ভাষা), অন্যদিকে মহাযানের সাহিত্য সংস্কৃত ভাষায় রচিত।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ:
ধম্মপদ: সুত্র পিটকের অংশ, বুদ্ধের নৈতিক উপদেশ।
ললিতবিস্তর: বুদ্ধের জীবনকাহিনি।
মিলিন্দপঞ্হা: ইন্দো-গ্রিক রাজা মিনান্দার এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে কথোপকথন।
১০. বৌদ্ধ ধর্মের অনুগামী ও পৃষ্ঠপোষক
প্রধান অনুগামী (ভিক্ষু): সারিপুত্র, মোগ্গলান, আনন্দ (বুদ্ধের ব্যক্তিগত পরিচারক), উপালি, মহাকাশ্যপ।
পৃষ্ঠপোষক রাজা:
বিম্বিসার ও অজাতশত্রু: মগধ সাম্রাজ্যের সমর্থন।
অশোক (মৌর্য): বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেন এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে দেন।
কণিষ্ক (কুষাণ): চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতির পৃষ্ঠপোষক, মহাযানের পৃষ্ঠপোষক।
হর্ষবর্ধন: বৌদ্ধ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক।
১১. বৌদ্ধ স্থাপত্য ও শিল্পকলা
বৌদ্ধ স্থাপত্য ভারতীয় শিল্পের এক অনন্য অধ্যায়।
বৈশিষ্ট্য:
স্তূপ (Stupa): বুদ্ধের দেহাবশেষ বা স্মৃতিচিহ্নের উপর নির্মিত গম্বুজাকৃতি সৌধ।
বিহার/বৈহার (Vihara): ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের আবাসস্থল বা মঠ।
চৈত্যগৃহ (Chaitya): প্রার্থনাকক্ষ বা উপাসনালয়।
পাথরের গুহা খোদাই শিল্প।
চিত্রশিল্পে মানবতাবাদ ও জাতকের গল্প।
উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য:
সাঞ্চি স্তূপ (মধ্যপ্রদেশ)
অমবাবতী স্তূপ (অন্ধ্রপ্রদেশ)
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় (বিহার)
অজন্তা ও ইলোরার বৌদ্ধ গুহা (মহারাষ্ট্র)
কুশীনগর, লুম্বিনী, বোধগয়া ইত্যাদি।
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
১. প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের পটভূমি (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক)
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় সমাজে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে যে অস্থিরতা দেখা যায়, তা জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের মূল কারণ।
মূল পটভূমি:
ধর্মীয় জটিলতা: ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জটিল যজ্ঞকর্ম, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে পালন করা কঠিন ছিল।
অর্থনৈতিক অপচয়: যজ্ঞে জীবহিংসা ও অতিরিক্ত অর্থব্যয়, যা কৃষিভিত্তিক সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
সামাজিক বৈষম্য: কঠোর বর্ণব্যবস্থা, যেখানে শূদ্র ও নিচুতলার মানুষ বঞ্চিত ছিল।
দার্শনিক অসঙ্গতি: উপনিষদীয় তত্ত্ব ছিল জটিল এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না।
নবীন শ্রেণীর আকাঙ্ক্ষা: নগর ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট বণিক শ্রেণী (বৈশ্য) সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করত। জৈন ধর্মে অহিংসার কারণে বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
ফলাফল: যজ্ঞ, বর্ণব্যবস্থা ও ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানবিক ও সমতাভিত্তিক আদর্শ নিয়ে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম আত্মপ্রকাশ করে।
২. জৈন ধর্মের উত্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্য
জৈন ধর্মের উত্থান ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রধানত বিহারের মগধ অঞ্চলে। এই ধর্মটি প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যমান, তবে এটি ২৪ জন তীর্থঙ্করের ধারাবাহিকতায় বিকশিত হয়েছে।
তীর্থঙ্কর: জৈন ধর্মের মহান শিক্ষাগুরু বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। এঁরা সংসার ত্যাগ করে 'কেবল জ্ঞান' বা 'কেবল্য' লাভ করেন।
প্রথম তীর্থঙ্কর: ঋষভনাথ বা আদিনাথ।
২৩তম তীর্থঙ্কর: পার্শ্বনাথ। ইনি চতুর্মহব্রত (অহিংসা, সত্য, অচৌর্য, অপরিগ্রহ) প্রচার করেন।
২৪তম (শেষ) তীর্থঙ্কর: মহাবীর (বর্ধমান) — সর্বাধিক প্রভাবশালী।
উত্থানের কারণ:
সমাজে অহিংসার আকাঙ্ক্ষা।
তপস্যা ও নৈতিকতার উপর চরম গুরুত্ব।
সহজ ভাষায় ধর্মচর্চা (অর্ধমাগধী প্রাকৃত)।
বর্ণভেদবিরোধী মানবিক ধর্ম।
৩. মহাবীর: জন্ম, কেবল্য লাভ ও দেহত্যাগ
জৈন ধর্মের প্রচার ও প্রসার মহাবীরের জীবন ও শিক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
ক) জন্ম ও বংশ পরিচয়
বিবরণ | তথ্য |
পূর্ণ নাম | বর্ধমান মহাবীর (Vardhamana Mahavira) |
জন্ম | খ্রিস্টপূর্ব ৫৪০ অব্দ |
জন্মস্থান | কুণ্ডলগ্ৰাম (বর্তমান বিহারের বৈশালীর কাছে) |
পিতা | সিদ্ধার্থ — জ্ঞানত্রিক কুলের প্রধান |
মাতা | ত্রিশলা — লিচ্ছবি গণরাজ্যের প্রধান চেতকের ভগিনী |
স্ত্রী | যশোধা |
কন্যা | প্রিয়দর্শনা (অনোজ্জা) |
গৃহত্যাগ: ৩০ বছর বয়সে সত্যের সন্ধানে বিলাসী জীবন পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন। ঘটনাটি মহাবিনিষ্ক্রমণ-এর অনুরূপ।
খ) দিব্য জ্ঞান লাভ (কেবল্য)
কঠোর তপস্যা: মহাবীর ১২ বছর কঠোর তপস্যা করেন।
কেবল্য লাভ: ৪২ বছর বয়সে জৃম্ভিকাগ্রামে, ঋজুপালিকা নদীর তীরে শাল গাছের নিচে।
উপাধি: জ্ঞানপ্রাপ্তির পর তিনি কেবলি (সর্বজ্ঞ), জিন (বিজয়ী) এবং মহাবীর (শ্রেষ্ঠ বীর) নামে পরিচিত হন।
গ) ধর্মপ্রচার ও দেহত্যাগ
প্রচার কাল ও ভাষা: জীবনের শেষ ৩০ বছর ধর্মপ্রচার করেন। ভাষা ব্যবহার করেন অর্ধমাগধী প্রাকৃত (সাধারণ মানুষের বোধগম্য)।
দেহত্যাগ: খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৮ অব্দে পাবাপুরী (বিহার) নামক স্থানে, ৭২ বছর বয়সে। ঘটনাটি জৈন মতে মহাপরিনির্বাণ-এর সমতুল্য।
৪. মহাবীরের ধর্মনীতি ও দর্শন
ক) ত্রিরত্ন (Three Jewels)
জৈন ধর্মের মূল দর্শন হলো এই তিনটি সঠিক পথ অনুসরণ করা:
1. সম্যক দর্শন (Right Faith): জৈন তীর্থঙ্করদের প্রতি সঠিক উপলব্ধি এবং বিশ্বাস।
2. সম্যক জ্ঞান (Right Knowledge): জৈন মতবাদ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন।
3. সম্যক চরিত্র (Right Conduct): পঞ্চমহাব্রত পালনের মাধ্যমে সঠিক আচরণ করা।
খ) পঞ্চমহাব্রত (Five Great Vows)
মহাবীর ২৩তম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের প্রচারিত চতুর্মহাব্রতের সঙ্গে ব্রহ্মচর্য যোগ করে এটিকে পঞ্চমহাব্রতে রূপ দেন।
1. অহিংসা (Ahimsa): কোনো প্রাণীকে ক্ষতি না করা (জৈন ধর্মে অহিংসা চরম পর্যায়ে)।
2. সত্য (Satya): সর্বদা সত্য ভাষণ করা।
3. অচৌর্য (Asteya): চুরি না করা (এমনকি অনুমতি ছাড়া কিছু গ্রহণ না করা)।
4. ব্রহ্মচর্য (Brahmacharya): ইন্দ্রিয়সংযম (মহাবীরের সংযোজন)।
5. অপরিগ্রহ (Aparigraha): সম্পদে আসক্তি ত্যাগ এবং সঞ্চয় না করা।
গ) দার্শনিক তত্ত্ব
অন্যকান্তবাদ (Anekantavada): এটি হলো সত্যের বহু দৃষ্টিভঙ্গি-র তত্ত্ব। সত্য বা জ্ঞান একক ও চরম নয়, বরং আপেক্ষিক ও বহুমাত্রিক (যেমন, হস্তী ও অন্ধদের উপমা)।
সয়াদবাদ (Syadvada): এটি হলো অন্যকান্তবাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকাশ বা আপেক্ষিকতা। এর অর্থ 'হতে পারে' বা 'কোনো দিক থেকে'। কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়, এটি সাতটি মাত্রায় প্রকাশ করা যায় (সপ্তভঙ্গীনয়)।
কর্ম ও পুনর্জন্ম: জৈন ধর্ম কর্মফলের উপর চরম গুরুত্ব দেয়। কর্মের ফলই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে এবং জৈনদের লক্ষ্য হলো কর্মের ফল থেকে মুক্ত হওয়া (নির্বাণ/মোক্ষ)।
৫. জৈন ধর্মের বিভাজন ও সংগীতি
ক) বিভাজনের কারণ
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মগধে ১২ বছরব্যাপী দুর্ভিক্ষ হলে জৈনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়:
1. ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে একদল সন্ন্যাসী দক্ষিণে (শ্রবণবেলগোলা) চলে যান।
2. স্থূলভদ্রের নেতৃত্বে অন্য দলটি মগধেই থেকে যান।
খ) দুটি সম্প্রদায়
সম্প্রদায় | দিগম্বর (Digambara - Sky-clad) | শ্বেতাম্বর (Shvetambara - White-clad) |
অর্থ | বস্ত্রপরিত্যাগী (দিকই যার অম্বর বা বস্ত্র) | সাদা বস্ত্র পরিধানকারী |
নেতা | ভদ্রবাহুর অনুগামী | স্থূলভদ্রের অনুগামী |
মুক্তির শর্ত | নারী মুক্তির সম্ভাবনা অস্বীকার; নগ্নতা আবশ্যক। | নারীর মুক্তি স্বীকার; নগ্নতা আবশ্যক নয়। |
তপস্যা | গুরুতর ও কঠোর তপস্যাপরায়ণ। | তুলনামূলক সহজ ও শিথিল তপস্যা। |
আগম সাহিত্য | আগম সাহিত্য গ্রহণ করে না। | আগম সাহিত্য গ্রহণ করে। |
গ) জৈন সংগীতি (Jain Councils)
সংগীতি | সময় | স্থান | সভাপতি | তাৎপর্য |
প্রথম | খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক | পাটলিপুত্র | স্থূলভদ্র | জৈন ধর্ম দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর— এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়। |
দ্বিতীয় | খ্রিস্টীয় ৫ম শতক (৪৫৩/৪৬৬) | বল্লভী (গুজরাট) | দেবার্ধি ক্ষেমশর্মণ। | আগম সাহিত্যকে চূড়ান্তভাবে সংকলিত করা হয়। |
৬. জৈন সাহিত্য, অনুগামী ও স্থাপত্য
ক) জৈন সাহিত্য
প্রধান গ্রন্থ: জৈন ধর্মের প্রধান গ্রন্থসমূহকে বলা হয় আগম (Agamas)।
ভাষা: অর্ধমাগধী প্রাকৃত (প্রাথমিক), পালি ও সংস্কৃত।
উল্লেখযোগ্য রচনা:
কল্পসূত্র : ভদ্রবাহু রচিত, মহাবীর ও অন্যান্য তীর্থঙ্করদের জীবনী।
তত্ত্বার্থসূত্র: উমাস্বাতি রচিত, জৈন দর্শনের একটি সংকলন।
খ) অনুগামী ও পৃষ্ঠপোষক
পৃষ্ঠপোষক রাজা:
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য: জীবনের শেষে জৈন সন্ন্যাস গ্রহণ করে ভদ্রবাহুর সঙ্গে দক্ষিণে (শ্রবণবেলগোলা) যান।
খারবেল: কলিঙ্গের শক্তিশালী রাজা, যিনি জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
গঙ্গ বংশ ও রাষ্ট্রকূট বংশের রাজারাও পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
গ) জৈন স্থাপত্য
দিলওয়াড়া মন্দির: মাউন্ট আবু, রাজস্থান। এটি মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
গোমটেশ্বর/বহুবলী মূর্তি: শ্রবণবেলগোলা, কর্ণাটক। এটি একটি বিশাল আকারের মনোলিথ (একশিলা) মূর্তি।
পাবাপুরী জলমন্দির: বিহার, মহাবীরের মহাপরিনির্বাণের স্থান।
রণকপুর জৈন মন্দির, রাজস্থান এবং গিরনার পাহাড়ের মন্দিরসমূহ।
🌟 বৌদ্ধ ধর্ম —
১. প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের পটভূমি (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক)
এই সময়কালে ভারতের সমাজে ধর্মীয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়।
মূল কারণ:
ধর্মীয় জটিলতা: যজ্ঞকেন্দ্রিক জটিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিস্তার।
অর্থনৈতিক বোঝা: যজ্ঞে জীবহিংসা ও অতিরিক্ত অর্থব্যয়।
সামাজিক বৈষম্য: কঠোর বর্ণব্যবস্থা এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রেণীশোষণ।
দার্শনিক শূন্যতা: দার্শনিক উপনিষদীয় তত্ত্ব সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না।
শ্রেণী অবদমন: কৃষক, শ্রেণী-মধ্যবিত্ত ও বণিক শ্রেণীর সামাজিক অবদমন।
ফলাফল: এই পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ ধর্ম অবৈদিক, মানবিক, সমতামূলক প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
২. বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান ও কারণ
বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটে প্রধানত মগধ ও কোশল অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে।
উত্থানের কারণ:
জটিল যজ্ঞের বিরোধিতা।
কৃষক ও সমাজের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
অহিংসা, সমতা ও যুক্তিবাদী দর্শনের প্রয়োগ।
সহজ ভাষায় ধর্মব্যাখ্যা (পালি ভাষা)।
৩. গৌতম বুদ্ধ: জন্ম ও বংশপরিচয়
বিবরণ | তথ্য |
জন্মনাম | সিদ্ধার্থ গৌতম (Siddhartha Gautama) |
জন্মস্থান | লুম্বিনী উদ্যান, কপিলাবস্তু (বর্তমান নেপাল) |
জন্ম তারিখ | খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দ |
বংশ | শাক্য গণরাজ্যের ক্ষত্রিয় বংশ (এজন্য তিনি শাক্যমুনি নামেও পরিচিত) |
পিতা | শুদ্ধোধন — শাক্য গণরাজ্যের প্রধান |
মাতা | মায়াদেবী (মৃত্যু হয় জন্মের ৭ দিন পর) |
বিমাতা | মহাপ্রজাপতি গৌতমী |
স্ত্রী | যশোধরা |
পুত্র | রাহুল |
অন্যান্য উপাধি | তথাগত (যিনি সত্য লাভ করেছেন) |
শৈশব ও যৌবন: সামরিক ও শাস্ত্রীয় শিক্ষায় পারদর্শী এবং বিলাসী জীবন যাপন করতেন।
পরিবর্তন: বিলাসী জীবন পরিত্যাগের পূর্বে "চার দর্শন"— বার্ধক্য, রোগ, মৃত্যু, সন্ন্যাসী— তাঁকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করে।
৪. বোধিলাভ (দিব্যজ্ঞান লাভ)
গৃহত্যাগ: ২৯ বছর বয়সে, ঘটনাটি মহাবিনিষ্ক্রমণ নামে পরিচিত।
তপস্যা: কঠোর তপস্যা শেষে উপলব্ধি— কঠোর তপস্যা নয়, প্রয়োজন মধ্যমার্গ।
বোধিলাভ: বোধগয়া, নীরঞ্জনা নদীর (ফাল্গু নদী) তীরে।
বয়স: ৩৫ বছর।
নাম পরিবর্তন: বোধিলাভের পর তিনি পরিচিত হন “বুদ্ধ” (The Enlightened One) নামে।
বোধিবৃক্ষ: পিপুল বা অশ্বত্থ গাছ (যা মহাবোধি বৃক্ষ নামে পরিচিত)।
৫. বৌদ্ধ ধর্মপ্রচার ও মহাপরিনির্বাণ
প্রথম ধর্মপ্রবর্তন: সারনাথ, মৃগদাব অরণ্যে (বারাণসীর কাছে) পাঁচজন শিষ্যের কাছে।
এটিকে বলা হয় ধর্মচক্র প্রবর্তন (Dharmachakra Pravartana)।
প্রতীক: চক্র বা চাকা।
প্রচারকাল ও ভাষা: ৪৫ বছর ধরে উত্তর ভারত জুড়ে ধর্মপ্রচার করেন। প্রচারের ভাষা ছিল পালি, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য।
প্রচারপদ্ধতি: উপদেশ (ধর্মদেশনা) প্রদান এবং সংঘজীবন প্রতিষ্ঠা।
মহাপরিনির্বাণ (দেহত্যাগ):
মৃত্যু: কুশীনগর, মল্ল রাজ্যের অন্তর্গত।
বয়স: ৮০ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৩ অব্দ, বা প্রচলিত মতে ৪৮৩ অব্দ)।
ঘটনাটি পরিচিত: মহাপরিনির্বাণ নামে।
প্রতীক: স্তূপ।
৬. বৌদ্ধ ধর্মের মূল আদর্শ ও দর্শন
ক) ত্রি-রত্ন (The Three Jewels)
বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি তিনটি—
1. বুদ্ধ (বুদ্ধত্ব অর্জন)
2. ধর্ম (বুদ্ধের শিক্ষা)
3. সংঘ (ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের সম্প্রদায়)
খ) চার আর্যসত্য (Four Noble Truths)
1. দুঃখ: জীবন দুঃখময়।
2. দুঃখ সমুদয়: দুঃখের কারণ হলো তৃষ্ণা বা কামনা।
3. দুঃখ নিরোধ: তৃষ্ণা বা কামনা নাশে দুঃখ নাশ করা সম্ভব।
4. দুঃখ নিরোধগামী প্রতিপদা (অষ্টাঙ্গিক মার্গ): দুঃখনাশের পথ হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ।
গ) অষ্টাঙ্গিক মার্গ (Eightfold Path)
দুঃখ নিবারণের জন্য আটটি সঠিক পথ—
বিভাগ | মার্গ | বিবরণ |
প্রজ্ঞা | ১. সম্যক দৃষ্টি (সঠিক জ্ঞান) | ২. সম্যক সংকল্প (সঠিক উদ্দেশ্য) |
শীল | ৩. সম্যক বাক (সঠিক কথা) | ৪. সম্যক কর্মান্ত (সঠিক কাজ) |
৫. সম্যক আজীবিকা (সঠিক জীবনযাত্রা/উপার্জন) | ||
সমাধি | ৬. সম্যক ব্যায়াম (সঠিক প্রচেষ্টা) | ৭. সম্যক স্মৃতি (সঠিক সচেতনতা) |
৮. সম্যক সমাধি (সঠিক ধ্যান) |
ঘ) অন্যান্য দর্শন
মধ্যমার্গ (Middle Path): না কঠোর তপস্যা, না বিলাসী জীবন — জীবনে ভারসাম্য।
অহিংসা: সকল প্রাণীর প্রতি সমান সহানুভূতি।
অনিত্য: সবকিছুই পরিবর্তনশীল; কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
অনাত্মবাদ: স্থায়ী কোনো ‘আত্মা’ নেই, কিন্তু কর্মের ধারাবাহিকতা নতুন জীবন সৃষ্টি করে (কর্মফল বা কর্ম)।
৭. বৌদ্ধদের সম্মেলন (বৌদ্ধ সংগীতি)
বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্মের নীতি ও আদর্শ আলোচনার জন্য চারটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংগীতি | সময় | স্থান | সভাপতি | পৃষ্ঠপোষক রাজা | তাৎপর্য |
প্রথম | ৪৪৩ বা ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্ব | রাজগৃহ (সপ্তপর্ণী গুহা) | মহাকাশ্যপ | অজাতশত্রু (হর্যঙ্ক) | বিনয় পিটক ও সূত্র পিটক সংকলন। |
দ্বিতীয় | ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্ব | বৈশালী | সবকামী বা সল্হ | কালাশোক (শিশুননাগ) | বিনয় পিটক সংক্রান্ত মতভেদ; সংঘের স্থবির ও মহাসাংঘিক গোষ্ঠীতে বিভাজন। |
তৃতীয় | ২৫০ খ্রিস্টপূর্ব | পাটলীপুত্র | মোগ্গলিপুত্ত তিষ্য | অশোক (মৌর্য) | অভিধর্ম পিটক সংকলন। |
চতুর্থ | খ্রিস্টীয় প্রথম শতক | কাশ্মীরের কুন্দলবন | বসুমিত্র ও অশ্বঘোষ | কণিষ্ক (কুষাণ) | বৌদ্ধ ধর্ম হীনযান ও মহাযান— এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়। |
৮. বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান সম্প্রদায় (বিভাজন)
মৌলিকভাবে বৌদ্ধ ধর্ম চারটি প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত—
সম্প্রদায় | মূল আদর্শ | ভাষা | বৈশিষ্ট্য |
১. হীনযান (Hinayana) | ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জন। | পালি | বুদ্ধকে সাধারণ মানুষ মনে করে; সংযমবাদ, থেরবাদ নামেও পরিচিত। |
২. মহাযান (Mahayana) | সর্বজনীন মুক্তি (সকলের নির্বাণ)। | সংস্কৃত | বুদ্ধকে ঈশ্বরতুল্য সম্মান (বোধিসত্ত্বের ধারণা), মূর্তি পূজা। |
৩. বজ্রযান (Vajrayana) | তান্ত্রিক প্রভাব ও মন্ত্র-তন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত নির্বাণ। | সংস্কৃত/তিব্বতি | তিব্বত, ভুটান, নেপালে জনপ্রিয়। |
৪. থেরবাদ (Theravada) | হীনযানের প্রাচীনতম রূপ, বর্তমানে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডে প্রচলিত। | পালি | প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিশ্বাসী। |
৯. বৌদ্ধ সাহিত্য
বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো ত্রিপিটক (তিনটি ঝুড়ি)।
পিটক | বিষয়বস্তু |
১. বিনয় পিটক | ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের আচরণবিধি ও নিয়মাবলী। |
২. সুত্র পিটক | বুদ্ধের উপদেশ ও কথোপকথনসমূহ (পাঁচটি নিকায় বিভক্ত)। |
৩. অভিধর্ম পিটক | ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ। |
ভাষা: ত্রিপিটকের মূল ভাষা হলো পালি (যা হীনযানের ভাষা), অন্যদিকে মহাযানের সাহিত্য সংস্কৃত ভাষায় রচিত।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ:
ধম্মপদ: সুত্র পিটকের অংশ, বুদ্ধের নৈতিক উপদেশ।
ললিতবিস্তর: বুদ্ধের জীবনকাহিনি।
মিলিন্দপঞ্হা: ইন্দো-গ্রিক রাজা মিনান্দার এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে কথোপকথন।
১০. বৌদ্ধ ধর্মের অনুগামী ও পৃষ্ঠপোষক
প্রধান অনুগামী (ভিক্ষু): সারিপুত্র, মোগ্গলান, আনন্দ (বুদ্ধের ব্যক্তিগত পরিচারক), উপালি, মহাকাশ্যপ।
পৃষ্ঠপোষক রাজা:
বিম্বিসার ও অজাতশত্রু: মগধ সাম্রাজ্যের সমর্থন।
অশোক (মৌর্য): বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেন এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে দেন।
কণিষ্ক (কুষাণ): চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতির পৃষ্ঠপোষক, মহাযানের পৃষ্ঠপোষক।
হর্ষবর্ধন: বৌদ্ধ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক।
১১. বৌদ্ধ স্থাপত্য ও শিল্পকলা
বৌদ্ধ স্থাপত্য ভারতীয় শিল্পের এক অনন্য অধ্যায়।
বৈশিষ্ট্য:
স্তূপ (Stupa): বুদ্ধের দেহাবশেষ বা স্মৃতিচিহ্নের উপর নির্মিত গম্বুজাকৃতি সৌধ।
বিহার/বৈহার (Vihara): ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের আবাসস্থল বা মঠ।
চৈত্যগৃহ (Chaitya): প্রার্থনাকক্ষ বা উপাসনালয়।
পাথরের গুহা খোদাই শিল্প।
চিত্রশিল্পে মানবতাবাদ ও জাতকের গল্প।
উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য:
সাঞ্চি স্তূপ (মধ্যপ্রদেশ)
অমবাবতী স্তূপ (অন্ধ্রপ্রদেশ)
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় (বিহার)
অজন্তা ও ইলোরার বৌদ্ধ গুহা (মহারাষ্ট্র)
কুশীনগর, লুম্বিনী, বোধগয়া ইত্যাদি।