ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ-এর প্রতিষ্ঠা ছিল ভারতের আধুনিক ইতিহাসের এবং বিশেষ করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশদের "বিভাজন ও শাসন" (Divide and Rule) নীতি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-এর পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আলিগড় আন্দোলনের রাজনৈতিক বিবর্তনের ফলস্বরূপ এই সংগঠনের জন্ম হয়। ব্রিটিশরা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান শক্তির কাউন্টার-ওয়েট (প্রতিপক্ষ) হিসেবে মুসলিম লীগকে সমর্থন ও উৎসাহ জুগিয়েছিল।
মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও সময়রেখা (Timeline of Events)
@ ১ অক্টোবর, ১৯০৬ (শিমলা ডেপুটেশন): আগা খান-এর নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মিন্টো (Lord Minto II)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনমণ্ডলী (Separate Electorate) এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি জানান। এটি ইতিহাসের শিমলা ডেপুটেশন নামে বিখ্যাত।
@ ৩০ ডিসেম্বর, ১৯০৬: ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ-এর আমন্ত্রণে ঢাকায় 'অল ইন্ডিয়া মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স'-এর বার্ষিক অধিবেশন বসে। এই সম্মেলনের শেষ দিনে নবাব সলিমুল্লাহর প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে "নিখিল ভারত মুসলিম লীগ" গঠিত হয়।
@ ১৯০৭: করাচিতে মুসলিম লীগের প্রথম বার্ষিক অধিবেশন বসে এবং এখানে লীগের সংবিধান বা "সবুজ বই" (Green Book) তৈরি করা হয়।
@ ১৯০৮: অমৃতসর অধিবেশনে মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক নির্বাচনমণ্ডলীর দাবি জোরালো করে, যা পরবর্তীতে ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনে ব্রিটিশ সরকার মঞ্জুর করে।
@ ১৯১৩ (জিন্নাহর যোগদান): মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। (মনে রাখবে, জিন্নাহ প্রথম জীবনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত ছিলেন)।
@ ১৯১৬ (লখনউ চুক্তি): জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে ঐতিহাসিক লখনউ চুক্তি (Lucknow Pact) স্বাক্ষরিত হয়। কংগ্রেস পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নেয় এবং দুই দল যৌথভাবে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে।
@ ১৯২৯ (জিন্নাহর ১৪ দফা দাবি): নেহেরু রিপোর্টের (১৯২৮) পালটা হিসেবে জিন্নাহ মুসলিম স্বার্থ রক্ষার্থে ১৪ দফা দাবি (14 Points) পেশ করেন।
@ ১৯৩০ (এলাহাবাদ অধিবেশন): কবি ও দার্শনিক স্যার মুহাম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলি নিয়ে একটি পৃথক রাজ্যের ধারণা দেন।
@ ১৯৩৩ (পাকিস্তান শব্দের উৎপত্তি): কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী তাঁর 'Now or Never' নামক ইশতেহারে প্রথম "Pakistan" শব্দটি ব্যবহার করেন।
@ ১৯৪০ (লাহোর প্রস্তাব): ২৩ মার্চ, ১৯৪০ তারিখে লীগের লাহোর অধিবেশনে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব (Lahore Resolution) বা 'পাকিস্তান প্রস্তাব'"দ্বিজাতি তত্ত্ব" (Two-Nation Theory) পেশ করেন। সভাপতি ছিলেন জিন্না ।
@ ১৯৪৬ (প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস): ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে জিন্নাহ ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬ তারিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস (Direct Action Day)-এর ডাক দেন, যার ফলে দেশজুড়ে বিশেষত কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয় (The Great Calcutta Killings)।
@ ২৩ মার্চ, ১৯৪০ (লাহোর প্রস্তাব): ফজলুল হকের উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে জিন্নাহ আনুষ্ঠানিকভাবে
মুসলিম লীগের প্রধান ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের ভূমিকা
ব্যক্তিত্বের নাম | মুসলিম লীগে ভূমিকা | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
নবাব সলিমুল্লাহ | মূল প্রতিষ্ঠাতা (Founder) | ঢাকার নবাব, যিনি লীগ গঠনের মূল উদ্যোক্তা ও প্রস্তাবক ছিলেন। |
আগা খান (তৃতীয়) | প্রথম স্থায়ী সভাপতি | শিমলা ডেপুটেশনের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯০৬ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত লীগের সভাপতি ছিলেন। |
নবাব মহসিন-উল-মূলক | প্রথম যুগ্ম সম্পাদক | আলিগড় আন্দোলনের অন্যতম স্তম্ভ এবং লীগ গঠনে নেপথ্য কারিগর। |
নবাব ভিকার-উল-মূলক | প্রথম যুগ্ম সম্পাদক | ঢাকার উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। |
মহম্মদ আলী জিন্নাহ | পরবর্তী প্রধান নেতা | ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন (তার আগে তিনি কংগ্রেসে ছিলেন)। |
(Objects of League)
১. ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতীয় মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা।
২. ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবিদাওয়াসমূহ সরকারের কাছে পেশ করা।
৩. লীগের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিমদের সদ্ভাব বজায় রাখা।
Exam Focus Point (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য)
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মিন্টো (দ্বিতীয়) এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব বা ভারত সচিব (Secretary of State) ছিলেন লর্ড মর্লে।
লর্ড মিন্টোর ব্যক্তিগত সচিব ডানলপ স্মিথ (Dunlop Smith) শিমলা ডেপুটেশনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
১৯০৮ সালে সৈয়দ আমির আলী লন্ডনে মুসলিম লীগের প্রথম বিদেশি শাখা (London Branch) স্থাপন করেন।
১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তি (Lucknow Pact): বাল গঙ্গাধর তিলক এবং মহম্মদ আলী জিন্নাহর যৌথ প্রচেষ্টায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে কংগ্রেস মুসলিমদের পৃথক নির্বাচনমণ্ডলীর দাবি মেনে নেয়।
১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশন: ফজলুল হকের উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে জিন্নাহ আনুষ্ঠানিকভাবে "দ্বিজাতি তত্ত্ব" (Two-Nation Theory) এবং স্বতন্ত্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি জানান।
Quick Revision Points (১৫টি অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট)
1. মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর, ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে।
2. ১ অক্টোবর, ১৯০৬ সালে শিমলা ডেপুটেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আগা খান (তৃতীয়)।
3. মুসলিম লীগ গঠনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ।
4. লীগের প্রথম আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে (১৯০৭, করাচি) এর সংবিধান "গ্রিন বুক" পাস হয়।
5. ১৯০৮ সালে লন্ডনে মুসলিম লীগের শাখা স্থাপন করেন সৈয়দ আমির আলী।
6. ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে মুসলিমদের পৃথক নির্বাচনমণ্ডলী দেওয়া হয়।
7. মহম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯১৩ সালে লীগে যোগ দেন।
8. ১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তির মাধ্যমে কংগ্রেস ও লীগ যৌথভাবে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানায়।
9. ১৯২৯ সালে নেহরু রিপোর্টের জবাবে জিন্নাহ তাঁর বিখ্যাত ১৪ দফা দাবি পেশ করেন।
10. ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ অধিবেশনে কবি মুহম্মদ ইকবাল প্রথম উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের জন্য পৃথক ভূখণ্ডের ধারণা দেন।
11. 'পাকিস্তান' শব্দটির জন্ম দেন চৌধুরী রহমত আলী ১৯৩৩ সালে।
12. ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়।
13. ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশনের পর লীগ ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ তারিখে 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' পালন করে।
14. ১৯৪৬ সালের অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে লিয়াকত আলী খান অর্থমন্ত্রী হন।
15. লীগের সাম্প্রদায়িক নীতির বিরোধী কিছু জাতীয়তাবাদী মুসলিম সংগঠন ছিল— আহরার আন্দোলন, খোদাই খিদমতগার এবং ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি।
২. Competitive Exam Special Section
Previous Year & Expected Facts
লীগ বিরোধী মুসলিম সংগঠন: নিখিল ভারত মুসলিম লীগ সমস্ত ভারতীয় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করত না। জাতীয়তাবাদী ধারার মুসলিমরা "আহরার আন্দোলন" (Ahrar Movement), "খোদাই খিদমতগার" (খান আব্দুল গফফর খান) এবং "কৃষক প্রজা পার্টি" (ফজলুল হক) গঠন করেছিলেন, যাঁরা লীগের সাম্প্রদায়িক নীতির বিরোধী ছিলেন।
জিন্নাহর ১৪ দফা (14 Points of Jinnah): ১৯২৯ সালে নেহরু রিপোর্টের (১৯২৮) পালটা হিসেবে জিন্নাহ মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় ১৪ দফা দাবি পেশ করেন।
Confusing Facts (বিভ্রান্তিকর তথ্যের সমাধান)
বিভ্রান্তি ১: মুসলিম লীগের ঢাকা উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতি বনাম প্রথম স্থায়ী সভাপতি।
সমাধান: ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ঢাকায় যে অধিবেশনে লীগ গঠিত হয়, সেই উদ্বোধনী সভার সভাপতি ছিলেন নবাব ভিকার-উল-মূলক। কিন্তু লীগের প্রথম "স্থায়ী" কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন আগা খান (তৃতীয়)।
বিভ্রান্তি ২: পাকিস্তান (Pakistan) শব্দের উদ্ভাবক বনাম পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক।
সমাধান: 'Pakistan' শব্দের প্রথম উদ্ভাবক হলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী (১৯৩৩ সালে 'Now or Never' নামক পুস্তিকায়)। কিন্তু ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে অফিসিয়াল পাকিস্তান প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন বাংলার বাঘ এ. কে. ফজলুল হক।
বিভ্রান্তি ৩: মহম্মদ আলী জিন্নাহ কি লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন?
সমাধান: না। জিন্নাহ ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধী ছিলেন এবং তিনি শুরুতে একে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন মনে করতেন। তিনি ১৯১৩ সালে লীগে যোগ দেন।
৩. Memory Tricks (Mnemonics)
"ঢাকার নবাব সলিম সস্তা আগাছা ভিকারীকে দান করলেন"
নবাব সলিম = নবাব সলিমুল্লাহ (মূল উদ্যোক্তা/প্রতিষ্ঠাতা)।
আগাছা = আগা খাঁ (প্রথম স্থায়ী সভাপতি)।
ভিকারী = ভিকার-উল-মূলক (প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক)।
ট্রিক ২: লীগের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মাইলফলক সাল
"৬ এ জন্ম, ৯ এ ভোট, ১৬ তে মিলন জোট"
৬ এ জন্ম = ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম।
৯ এ ভোট = ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো আইনে পৃথক ভোট বা নির্বাচনমণ্ডলীর অধিকার লাভ।
১৬ তে মিলন জোট = ১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তিতে কংগ্রেসের সাথে জোট।
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ-এর প্রতিষ্ঠা ছিল ভারতের আধুনিক ইতিহাসের এবং বিশেষ করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশদের "বিভাজন ও শাসন" (Divide and Rule) নীতি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-এর পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আলিগড় আন্দোলনের রাজনৈতিক বিবর্তনের ফলস্বরূপ এই সংগঠনের জন্ম হয়। ব্রিটিশরা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান শক্তির কাউন্টার-ওয়েট (প্রতিপক্ষ) হিসেবে মুসলিম লীগকে সমর্থন ও উৎসাহ জুগিয়েছিল।
মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও সময়রেখা (Timeline of Events)
@ ১ অক্টোবর, ১৯০৬ (শিমলা ডেপুটেশন): আগা খান-এর নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মিন্টো (Lord Minto II)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনমণ্ডলী (Separate Electorate) এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি জানান। এটি ইতিহাসের শিমলা ডেপুটেশন নামে বিখ্যাত।
@ ৩০ ডিসেম্বর, ১৯০৬: ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ-এর আমন্ত্রণে ঢাকায় 'অল ইন্ডিয়া মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স'-এর বার্ষিক অধিবেশন বসে। এই সম্মেলনের শেষ দিনে নবাব সলিমুল্লাহর প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে "নিখিল ভারত মুসলিম লীগ" গঠিত হয়।
@ ১৯০৭: করাচিতে মুসলিম লীগের প্রথম বার্ষিক অধিবেশন বসে এবং এখানে লীগের সংবিধান বা "সবুজ বই" (Green Book) তৈরি করা হয়।
@ ১৯০৮: অমৃতসর অধিবেশনে মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক নির্বাচনমণ্ডলীর দাবি জোরালো করে, যা পরবর্তীতে ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনে ব্রিটিশ সরকার মঞ্জুর করে।
@ ১৯১৩ (জিন্নাহর যোগদান): মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। (মনে রাখবে, জিন্নাহ প্রথম জীবনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত ছিলেন)।
@ ১৯১৬ (লখনউ চুক্তি): জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে ঐতিহাসিক লখনউ চুক্তি (Lucknow Pact) স্বাক্ষরিত হয়। কংগ্রেস পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নেয় এবং দুই দল যৌথভাবে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে।
@ ১৯২৯ (জিন্নাহর ১৪ দফা দাবি): নেহেরু রিপোর্টের (১৯২৮) পালটা হিসেবে জিন্নাহ মুসলিম স্বার্থ রক্ষার্থে ১৪ দফা দাবি (14 Points) পেশ করেন।
@ ১৯৩০ (এলাহাবাদ অধিবেশন): কবি ও দার্শনিক স্যার মুহাম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলি নিয়ে একটি পৃথক রাজ্যের ধারণা দেন।
@ ১৯৩৩ (পাকিস্তান শব্দের উৎপত্তি): কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী তাঁর 'Now or Never' নামক ইশতেহারে প্রথম "Pakistan" শব্দটি ব্যবহার করেন।
@ ১৯৪০ (লাহোর প্রস্তাব): ২৩ মার্চ, ১৯৪০ তারিখে লীগের লাহোর অধিবেশনে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব (Lahore Resolution) বা 'পাকিস্তান প্রস্তাব'"দ্বিজাতি তত্ত্ব" (Two-Nation Theory) পেশ করেন। সভাপতি ছিলেন জিন্না ।
@ ১৯৪৬ (প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস): ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে জিন্নাহ ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬ তারিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস (Direct Action Day)-এর ডাক দেন, যার ফলে দেশজুড়ে বিশেষত কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয় (The Great Calcutta Killings)।
@ ২৩ মার্চ, ১৯৪০ (লাহোর প্রস্তাব): ফজলুল হকের উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে জিন্নাহ আনুষ্ঠানিকভাবে
মুসলিম লীগের প্রধান ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের ভূমিকা
ব্যক্তিত্বের নাম | মুসলিম লীগে ভূমিকা | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
নবাব সলিমুল্লাহ | মূল প্রতিষ্ঠাতা (Founder) | ঢাকার নবাব, যিনি লীগ গঠনের মূল উদ্যোক্তা ও প্রস্তাবক ছিলেন। |
আগা খান (তৃতীয়) | প্রথম স্থায়ী সভাপতি | শিমলা ডেপুটেশনের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯০৬ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত লীগের সভাপতি ছিলেন। |
নবাব মহসিন-উল-মূলক | প্রথম যুগ্ম সম্পাদক | আলিগড় আন্দোলনের অন্যতম স্তম্ভ এবং লীগ গঠনে নেপথ্য কারিগর। |
নবাব ভিকার-উল-মূলক | প্রথম যুগ্ম সম্পাদক | ঢাকার উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। |
মহম্মদ আলী জিন্নাহ | পরবর্তী প্রধান নেতা | ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন (তার আগে তিনি কংগ্রেসে ছিলেন)। |
(Objects of League)
১. ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতীয় মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা।
২. ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবিদাওয়াসমূহ সরকারের কাছে পেশ করা।
৩. লীগের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিমদের সদ্ভাব বজায় রাখা।
Exam Focus Point (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য)
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মিন্টো (দ্বিতীয়) এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব বা ভারত সচিব (Secretary of State) ছিলেন লর্ড মর্লে।
লর্ড মিন্টোর ব্যক্তিগত সচিব ডানলপ স্মিথ (Dunlop Smith) শিমলা ডেপুটেশনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
১৯০৮ সালে সৈয়দ আমির আলী লন্ডনে মুসলিম লীগের প্রথম বিদেশি শাখা (London Branch) স্থাপন করেন।
১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তি (Lucknow Pact): বাল গঙ্গাধর তিলক এবং মহম্মদ আলী জিন্নাহর যৌথ প্রচেষ্টায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে কংগ্রেস মুসলিমদের পৃথক নির্বাচনমণ্ডলীর দাবি মেনে নেয়।
১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশন: ফজলুল হকের উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে জিন্নাহ আনুষ্ঠানিকভাবে "দ্বিজাতি তত্ত্ব" (Two-Nation Theory) এবং স্বতন্ত্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি জানান।
Quick Revision Points (১৫টি অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট)
1. মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর, ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে।
2. ১ অক্টোবর, ১৯০৬ সালে শিমলা ডেপুটেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আগা খান (তৃতীয়)।
3. মুসলিম লীগ গঠনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ।
4. লীগের প্রথম আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে (১৯০৭, করাচি) এর সংবিধান "গ্রিন বুক" পাস হয়।
5. ১৯০৮ সালে লন্ডনে মুসলিম লীগের শাখা স্থাপন করেন সৈয়দ আমির আলী।
6. ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে মুসলিমদের পৃথক নির্বাচনমণ্ডলী দেওয়া হয়।
7. মহম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯১৩ সালে লীগে যোগ দেন।
8. ১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তির মাধ্যমে কংগ্রেস ও লীগ যৌথভাবে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানায়।
9. ১৯২৯ সালে নেহরু রিপোর্টের জবাবে জিন্নাহ তাঁর বিখ্যাত ১৪ দফা দাবি পেশ করেন।
10. ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ অধিবেশনে কবি মুহম্মদ ইকবাল প্রথম উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের জন্য পৃথক ভূখণ্ডের ধারণা দেন।
11. 'পাকিস্তান' শব্দটির জন্ম দেন চৌধুরী রহমত আলী ১৯৩৩ সালে।
12. ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়।
13. ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশনের পর লীগ ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ তারিখে 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' পালন করে।
14. ১৯৪৬ সালের অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে লিয়াকত আলী খান অর্থমন্ত্রী হন।
15. লীগের সাম্প্রদায়িক নীতির বিরোধী কিছু জাতীয়তাবাদী মুসলিম সংগঠন ছিল— আহরার আন্দোলন, খোদাই খিদমতগার এবং ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি।
২. Competitive Exam Special Section
Previous Year & Expected Facts
লীগ বিরোধী মুসলিম সংগঠন: নিখিল ভারত মুসলিম লীগ সমস্ত ভারতীয় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করত না। জাতীয়তাবাদী ধারার মুসলিমরা "আহরার আন্দোলন" (Ahrar Movement), "খোদাই খিদমতগার" (খান আব্দুল গফফর খান) এবং "কৃষক প্রজা পার্টি" (ফজলুল হক) গঠন করেছিলেন, যাঁরা লীগের সাম্প্রদায়িক নীতির বিরোধী ছিলেন।
জিন্নাহর ১৪ দফা (14 Points of Jinnah): ১৯২৯ সালে নেহরু রিপোর্টের (১৯২৮) পালটা হিসেবে জিন্নাহ মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় ১৪ দফা দাবি পেশ করেন।
Confusing Facts (বিভ্রান্তিকর তথ্যের সমাধান)
বিভ্রান্তি ১: মুসলিম লীগের ঢাকা উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতি বনাম প্রথম স্থায়ী সভাপতি।
সমাধান: ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ঢাকায় যে অধিবেশনে লীগ গঠিত হয়, সেই উদ্বোধনী সভার সভাপতি ছিলেন নবাব ভিকার-উল-মূলক। কিন্তু লীগের প্রথম "স্থায়ী" কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন আগা খান (তৃতীয়)।
বিভ্রান্তি ২: পাকিস্তান (Pakistan) শব্দের উদ্ভাবক বনাম পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক।
সমাধান: 'Pakistan' শব্দের প্রথম উদ্ভাবক হলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী (১৯৩৩ সালে 'Now or Never' নামক পুস্তিকায়)। কিন্তু ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে অফিসিয়াল পাকিস্তান প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন বাংলার বাঘ এ. কে. ফজলুল হক।
বিভ্রান্তি ৩: মহম্মদ আলী জিন্নাহ কি লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন?
সমাধান: না। জিন্নাহ ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধী ছিলেন এবং তিনি শুরুতে একে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন মনে করতেন। তিনি ১৯১৩ সালে লীগে যোগ দেন।
৩. Memory Tricks (Mnemonics)
"ঢাকার নবাব সলিম সস্তা আগাছা ভিকারীকে দান করলেন"
নবাব সলিম = নবাব সলিমুল্লাহ (মূল উদ্যোক্তা/প্রতিষ্ঠাতা)।
আগাছা = আগা খাঁ (প্রথম স্থায়ী সভাপতি)।
ভিকারী = ভিকার-উল-মূলক (প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক)।
ট্রিক ২: লীগের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মাইলফলক সাল
"৬ এ জন্ম, ৯ এ ভোট, ১৬ তে মিলন জোট"
৬ এ জন্ম = ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম।
৯ এ ভোট = ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো আইনে পৃথক ভোট বা নির্বাচনমণ্ডলীর অধিকার লাভ।
১৬ তে মিলন জোট = ১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তিতে কংগ্রেসের সাথে জোট।