নেহরু রিপোর্ট (Nehru Report, 1928)
নেহরু রিপোর্ট ছিল ভারতীয় নেতাদের দ্বারা ভারতের জন্য একটি সম্পূর্ণ খসড়া সংবিধান তৈরির প্রথম ঐতিহাসিক ও গৌরবময় প্রচেষ্টা। ব্রিটিশদের এই ঔপনিবেশিক চ্যালেঞ্জের জবাবে যে ভারতীয়রা নিজেদের শাসনতন্ত্র নিজেরা তৈরি করতে সক্ষম, তা প্রমাণ করতেই এই ঐতিহাসিক দলিলটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।
পটভূমি ও লর্ড বার্কেনহেডের চ্যালেঞ্জ (Background)
মূল কারণ: ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার সাইমন কমিশন গঠন করে, যাতে কোনো ভারতীয় সদস্য ছিল না। ভারতীয়রা এর তীব্র প্রতিবাদ জানালে তৎকালীন ভারত সচিব (Secretary of State) লর্ড বার্কেনহেড (Lord Birkenhead) ভারতীয় নেতাদের উপহাস করে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
চ্যালেঞ্জটি কী ছিল? তিনি বলেন, ভারতীয়রা এমন একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করে দেখাক, যা ভারতের সমস্ত রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায় একযোগে মেনে নেবে।
সর্বদলীয় সম্মেলন: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এবং ১৯২৮ সালের গোড়ার দিকে দিল্লী ও বোম্বাইয়ে একটি সর্বদলীয় সম্মেলন (All Parties Conference) ডাকে। এই সম্মেলনেই ভারতের নতুন সংবিধানের রূপরেখা তৈরির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি গঠন ও সদস্যবৃন্দ
চেয়ারম্যান: এই খসড়া সংবিধান কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহরু (Motilal Nehru)। তাঁর নামানুসারেই এই দলিলটির নাম হয় "নেহরু রিপোর্ট"।
সম্পাদক: কমিটির সেক্রেটারি বা সম্পাদক ছিলেন তাঁর পুত্র জওহরলাল নেহরু।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য: তেজ বাহাদুর সপ্রু (উদারপন্থী), সুভাষচন্দ্র বসু (কংগ্রেস), স্যার আলী ইমাম ও শোয়েব কুরেশী (মুসলিম), এম. এস. আনে ও আর. আর. জয়কর (হিন্দু মহাসভা), এবং জি. আর. প্রধান (অস্পৃশ্য শ্রেণী)
· তারিখ ও স্থান: ১৯২৮ সালের মে মাসে বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে ভারতের জন্য একটি খসড়া সংবিধান তৈরির উদ্দেশ্যে ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
· সভাপতি: এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহরু (পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পিতা)।
· সম্পাদক: কমিটির সেক্রেটারি বা সম্পাদক ছিলেন জওহরলাল নেহরু।
· অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য: তেজ বাহাদুর সপ্রু (উদারপন্থী), সুভাষচন্দ্র বসু (কংগ্রেস), আলি ইমাম ও শুয়াইব কুরেশি (মুসলিম লীগ), এম. এস. আনে ও মঙ্গল সিং।
⚠️ মনে রাখবেন: এই রিপোর্টের নাম মতিলাল নেহরু-র নামানুসারে 'নেহরু রিপোর্ট' হয়েছে, জওহরলাল নেহরুর নামে নয়।
নেহরু রিপোর্টের প্রধান সুপারিশসমূহ (Key Recommendations)
১৯২৮ সালের আগস্ট মাসে লখনউতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে এই রিপোর্টটি পেশ করা হয়। এর মূল সুপারিশগুলি ছিল নিম্নরূপ:
১. ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস (Dominion Status): ভারতের রাজনৈতিক লক্ষ্য হবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো স্বায়ত্তশাসন বা 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'। (এটিই পরবর্তীতে কংগ্রেসের তরুণ তুর্কি যেমন সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরুর অসন্তোষের কারণ হয়)।
২. যুগ্ম নির্বাচন মণ্ডলী (Joint Electorates): মুসলিম লীগের দীর্ঘদিনের দাবি পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী (Separate Electorates) সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হয়। তার পরিবর্তে যৌথ বা যুগ্ম নির্বাচন মণ্ডলীর সুপারিশ করা হয়, যেখানে সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে।
৩. আসন সংরক্ষণ নীতি: মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে কেন্দ্র এবং যে সমস্ত প্রদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, সেখানে আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়। তবে বাংলা এবং পাঞ্জাবের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে কোনো আসন সংরক্ষণ দেওয়া হয়নি।
৪. মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights): ভারতের নাগরিকদের জন্য ১৯টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়, যার মধ্যে ২১ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী ও পুরুষদের জন্য সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার এবং নারীদের সমান অধিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৫. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও অবশিষ্ট ক্ষমতা: কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো (Federal Structure) গঠনের কথা বলা হলেও, সমস্ত অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়।
৬. ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গঠন: প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ পুনর্গঠনের কথা বলা হয়। এই প্রেক্ষিতে সিন্ধু প্রদেশকে বোম্বাই থেকে আলাদা করার সুপারিশ করা হয়।
৭. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State): রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠিত হবে।
৮. সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা: বিচারব্যবস্থার শীর্ষে একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
রিপোর্টের পরিণতি ও ব্যর্থতার কারণ
নেহরু রিপোর্ট অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল হলেও লর্ড বার্কেনহেডের শর্ত অনুযায়ী এটি সর্বসম্মত হতে পারেনি।
এর প্রধান কারণ দুটি:
১. মুসলিম লীগের আপত্তি (জিন্নাহর ১৪ দফা): যৌথ নির্বাচনমণ্ডলী ও কেন্দ্রের হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা রাখার তীব্র বিরোধিতা করেন মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি এর পালটা হিসেবে ১৯২৯ সালে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষায় তাঁর বিখ্যাত "১৪ দফা দাবি" (14 Points of Jinnah) পেশ করেন।
২. তরুণ তুর্কিদের ক্ষোভ (কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব): জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তরুণ চরমপন্থী নেতারা 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'-এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের বদলে "পূর্ণ স্বরাজ" (Complete Independence)-এর দাবিতে অটল থাকেন এবং চাপ সৃষ্টির জন্য "ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ" (Indian Independence League) গঠন করেন।
Exam Focus Point (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য)
নেহরু রিপোর্ট পেশের সময় ভারতের ভাইসরয়: লর্ড আরউইন (Lord Irwin)।
রিপোর্টের মূল রূপকার: মতিলাল নেহরু (জওহরলাল নেহরু নন, এটি পরীক্ষায় বারংবার বিভ্রান্তি তৈরি করে)।
মৌলিক অধিকারের সংখ্যা: এই রিপোর্টে ভারতীয়দের জন্য ১৯টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার অন্যতম ছিল
কংগ্রেসের আলটিমেটাম: ১৯২৮ সালের কলকাতা অধিবেশনে কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারকে আলটিমেটাম দেয় যে, ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নেহরু রিপোর্ট (ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস) মেনে না নিলে কংগ্রেস 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর আন্দোলন শুরু করবে। ব্রিটিশরা তা না মানায় ১৯২৯-এর লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ প্রস্তাব পাস হয়।
সংক্ষিপ্ত Revision Notes
নেহরু রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল ১৯২৮ সালে।
এটি ছিল ভারত সচিব লর্ড বার্কেনহেডের চ্যালেঞ্জের জবাব।
খসড়া সংবিধান কমিটির সভাপতি ছিলেন মতিলাল নেহরু।
কমিটির সম্পাদক ছিলেন জওহরলাল নেহরু।
রিপোর্টের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস দেওয়া।
এতে সাম্প্রদায়িক পৃ্থক নির্বাচনমণ্ডলী বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল।
অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
নাগরিকদের জন্য ১৯টি মৌলিক অধিকারের দাবি জানানো হয়েছিল।
সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে পৃথক করার কথা এই রিপোর্টে প্রথম বলা হয়।
জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের বদলে পূর্ণ স্বরাজ চেয়েছিলেন।
নেহরু রিপোর্টের প্রতিবাদে জিন্নাহ ১৪ দফা দাবি (১৯২৯) পেশ করেন।
হিন্দু মহাসভাও মুসলিমদের জন্য আসন সংরক্ষণের কিছু ধারার বিরোধিতা করেছিল।
সর্বসম্মতি না মেলায় লর্ড আরউইন এই রিপোর্ট সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
এই রিপোর্টের ব্যর্থতার পরেই ১৯২৯ সালে ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশন ও পূর্ণ স্বরাজের ডাক দেওয়া হয়।
এটি ছিল ভারতীয়দের দ্বারা তৈরি ভারতের প্রথম খসড়া সংবিধান।
Previous Year Questions-এর ধাঁচে গুরুত্বপূর্ণ Facts:
ইন্ডিপেন্ডেন্স ফর ইন্ডিয়া লীগ (Independence for India League): নেহরু রিপোর্টের 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'-এর লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ১৯২৮ সালে জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু যৌথভাবে এই লিগ গঠন করেন, যা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসারে কাজ করেছিল।
লখনউ সর্বদলীয় সম্মেলন (আগস্ট ১৯২৮): এই সম্মেলনেই নেহরু রিপোর্টটি সর্বসমক্ষে পাঠ করা হয় এবং প্রাথমিক অনুমোদন পায়।
কোন শিখ নেতা নেহরু কমিটির সদস্য ছিলেন? সর্দার মঙ্গল সিং এই কমিটিতে শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
নেহরু কমিটির খসড়া সংবিধান তৈরিতে উদারপন্থী বা লিবারেল ফেডারেশনের প্রতিনিধি কে ছিলেন?" উত্তর: তেজ বাহাদুর সপ্রু।
নেহরু রিপোর্টে ভোটাধিকারের বয়স কত নির্ধারণ করা হয়েছিল? উত্তর: ২১ বছর (মনে রাখবেন, বর্তমানে এটি ১৮ বছর, যা ৬১তম সংশোধনী আইন ১৯৮৯ দ্বারা করা হয়েছে)।
কোন অধিবেশনে নেহরু রিপোর্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল? উত্তর: ১৯২৮ সালের আগস্টের লখনউ সর্বদলীয় সম্মেলন এবং পরবর্তীতে ডিসেম্বরের কলকাতা অধিবেশনে।
Confusing Facts (বিভ্রান্তিকর তথ্যের তুলনা):
নেহরু রিপোর্ট বনারস কংগ্রেস বনাম সর্বদলীয় সম্মেলন: নেহরু রিপোর্ট কোনো একক দলের তৈরি ছিল না। কংগ্রেস উদ্যোগ নিলেও এটি ছিল একটি সর্বদলীয় কমিটির (All Parties Committee) যৌথ দলিল।
অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers): নেহরু রিপোর্টে অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখার কথা বলা হয়েছিল (যা কানাডার সংবিধানের মতো)। কিন্তু জিন্নাহর ১৪ দফায় অবশিষ্ট ক্ষমতা প্রদেশের হাতে রাখার দাবি জানানো হয়েছিল (আমেরিকার সংবিধানের মতো)।
বিভ্রান্তিকর বিষয় | নেহরু রিপোর্ট (1928) এর অবস্থান | জিন্নাহর ১৪ দফা (1929) / মুসলিম লীগের অবস্থান |
অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) | কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়। | প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করার দাবি জানানো হয়। |
নির্বাচন মণ্ডলী (Electorate) | পৃথক নির্বাচন বাতিল করে যৌথ নির্বাচন (Joint Electorate) প্রবর্তন। | পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী (Separate Electorates) বজায় রাখার দাবি। |
কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম আসন | জনসংখ্যার অনুপাতে আসন সংরক্ষণ (১/৩ অংশ নির্দিষ্ট নয়)। | কেন্দ্রীয় আইনসভায় স্পষ্ট ১/৩ অংশ (One-third) মুসলিম আসন দাবি। |
সিন্ধু প্রদেশ গঠন | বোম্বাই থেকে সিন্ধুকে আলাদা করার কথা বলা হলেও তা ডোমিনিয়ন পাওয়ার পর কার্যকর করার শর্ত ছিল। | অবিলম্বে সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে পৃথক করে সম্পূর্ণ মুসলিম প্রধান প্রদেশ গঠনের দাবি। |
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
নেহরু রিপোর্ট (Nehru Report, 1928)
নেহরু রিপোর্ট ছিল ভারতীয় নেতাদের দ্বারা ভারতের জন্য একটি সম্পূর্ণ খসড়া সংবিধান তৈরির প্রথম ঐতিহাসিক ও গৌরবময় প্রচেষ্টা। ব্রিটিশদের এই ঔপনিবেশিক চ্যালেঞ্জের জবাবে যে ভারতীয়রা নিজেদের শাসনতন্ত্র নিজেরা তৈরি করতে সক্ষম, তা প্রমাণ করতেই এই ঐতিহাসিক দলিলটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।
পটভূমি ও লর্ড বার্কেনহেডের চ্যালেঞ্জ (Background)
মূল কারণ: ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার সাইমন কমিশন গঠন করে, যাতে কোনো ভারতীয় সদস্য ছিল না। ভারতীয়রা এর তীব্র প্রতিবাদ জানালে তৎকালীন ভারত সচিব (Secretary of State) লর্ড বার্কেনহেড (Lord Birkenhead) ভারতীয় নেতাদের উপহাস করে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
চ্যালেঞ্জটি কী ছিল? তিনি বলেন, ভারতীয়রা এমন একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করে দেখাক, যা ভারতের সমস্ত রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায় একযোগে মেনে নেবে।
সর্বদলীয় সম্মেলন: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এবং ১৯২৮ সালের গোড়ার দিকে দিল্লী ও বোম্বাইয়ে একটি সর্বদলীয় সম্মেলন (All Parties Conference) ডাকে। এই সম্মেলনেই ভারতের নতুন সংবিধানের রূপরেখা তৈরির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি গঠন ও সদস্যবৃন্দ
চেয়ারম্যান: এই খসড়া সংবিধান কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহরু (Motilal Nehru)। তাঁর নামানুসারেই এই দলিলটির নাম হয় "নেহরু রিপোর্ট"।
সম্পাদক: কমিটির সেক্রেটারি বা সম্পাদক ছিলেন তাঁর পুত্র জওহরলাল নেহরু।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য: তেজ বাহাদুর সপ্রু (উদারপন্থী), সুভাষচন্দ্র বসু (কংগ্রেস), স্যার আলী ইমাম ও শোয়েব কুরেশী (মুসলিম), এম. এস. আনে ও আর. আর. জয়কর (হিন্দু মহাসভা), এবং জি. আর. প্রধান (অস্পৃশ্য শ্রেণী)
· তারিখ ও স্থান: ১৯২৮ সালের মে মাসে বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে ভারতের জন্য একটি খসড়া সংবিধান তৈরির উদ্দেশ্যে ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
· সভাপতি: এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহরু (পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পিতা)।
· সম্পাদক: কমিটির সেক্রেটারি বা সম্পাদক ছিলেন জওহরলাল নেহরু।
· অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য: তেজ বাহাদুর সপ্রু (উদারপন্থী), সুভাষচন্দ্র বসু (কংগ্রেস), আলি ইমাম ও শুয়াইব কুরেশি (মুসলিম লীগ), এম. এস. আনে ও মঙ্গল সিং।
⚠️ মনে রাখবেন: এই রিপোর্টের নাম মতিলাল নেহরু-র নামানুসারে 'নেহরু রিপোর্ট' হয়েছে, জওহরলাল নেহরুর নামে নয়।
নেহরু রিপোর্টের প্রধান সুপারিশসমূহ (Key Recommendations)
১৯২৮ সালের আগস্ট মাসে লখনউতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে এই রিপোর্টটি পেশ করা হয়। এর মূল সুপারিশগুলি ছিল নিম্নরূপ:
১. ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস (Dominion Status): ভারতের রাজনৈতিক লক্ষ্য হবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো স্বায়ত্তশাসন বা 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'। (এটিই পরবর্তীতে কংগ্রেসের তরুণ তুর্কি যেমন সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরুর অসন্তোষের কারণ হয়)।
২. যুগ্ম নির্বাচন মণ্ডলী (Joint Electorates): মুসলিম লীগের দীর্ঘদিনের দাবি পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী (Separate Electorates) সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হয়। তার পরিবর্তে যৌথ বা যুগ্ম নির্বাচন মণ্ডলীর সুপারিশ করা হয়, যেখানে সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে।
৩. আসন সংরক্ষণ নীতি: মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে কেন্দ্র এবং যে সমস্ত প্রদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, সেখানে আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়। তবে বাংলা এবং পাঞ্জাবের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে কোনো আসন সংরক্ষণ দেওয়া হয়নি।
৪. মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights): ভারতের নাগরিকদের জন্য ১৯টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়, যার মধ্যে ২১ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী ও পুরুষদের জন্য সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার এবং নারীদের সমান অধিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৫. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও অবশিষ্ট ক্ষমতা: কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো (Federal Structure) গঠনের কথা বলা হলেও, সমস্ত অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়।
৬. ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গঠন: প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ পুনর্গঠনের কথা বলা হয়। এই প্রেক্ষিতে সিন্ধু প্রদেশকে বোম্বাই থেকে আলাদা করার সুপারিশ করা হয়।
৭. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State): রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠিত হবে।
৮. সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা: বিচারব্যবস্থার শীর্ষে একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
রিপোর্টের পরিণতি ও ব্যর্থতার কারণ
নেহরু রিপোর্ট অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল হলেও লর্ড বার্কেনহেডের শর্ত অনুযায়ী এটি সর্বসম্মত হতে পারেনি।
এর প্রধান কারণ দুটি:
১. মুসলিম লীগের আপত্তি (জিন্নাহর ১৪ দফা): যৌথ নির্বাচনমণ্ডলী ও কেন্দ্রের হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা রাখার তীব্র বিরোধিতা করেন মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি এর পালটা হিসেবে ১৯২৯ সালে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষায় তাঁর বিখ্যাত "১৪ দফা দাবি" (14 Points of Jinnah) পেশ করেন।
২. তরুণ তুর্কিদের ক্ষোভ (কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব): জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তরুণ চরমপন্থী নেতারা 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'-এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের বদলে "পূর্ণ স্বরাজ" (Complete Independence)-এর দাবিতে অটল থাকেন এবং চাপ সৃষ্টির জন্য "ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ" (Indian Independence League) গঠন করেন।
Exam Focus Point (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য)
নেহরু রিপোর্ট পেশের সময় ভারতের ভাইসরয়: লর্ড আরউইন (Lord Irwin)।
রিপোর্টের মূল রূপকার: মতিলাল নেহরু (জওহরলাল নেহরু নন, এটি পরীক্ষায় বারংবার বিভ্রান্তি তৈরি করে)।
মৌলিক অধিকারের সংখ্যা: এই রিপোর্টে ভারতীয়দের জন্য ১৯টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার অন্যতম ছিল
কংগ্রেসের আলটিমেটাম: ১৯২৮ সালের কলকাতা অধিবেশনে কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারকে আলটিমেটাম দেয় যে, ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নেহরু রিপোর্ট (ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস) মেনে না নিলে কংগ্রেস 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর আন্দোলন শুরু করবে। ব্রিটিশরা তা না মানায় ১৯২৯-এর লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ প্রস্তাব পাস হয়।
সংক্ষিপ্ত Revision Notes
নেহরু রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল ১৯২৮ সালে।
এটি ছিল ভারত সচিব লর্ড বার্কেনহেডের চ্যালেঞ্জের জবাব।
খসড়া সংবিধান কমিটির সভাপতি ছিলেন মতিলাল নেহরু।
কমিটির সম্পাদক ছিলেন জওহরলাল নেহরু।
রিপোর্টের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস দেওয়া।
এতে সাম্প্রদায়িক পৃ্থক নির্বাচনমণ্ডলী বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল।
অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
নাগরিকদের জন্য ১৯টি মৌলিক অধিকারের দাবি জানানো হয়েছিল।
সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে পৃথক করার কথা এই রিপোর্টে প্রথম বলা হয়।
জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের বদলে পূর্ণ স্বরাজ চেয়েছিলেন।
নেহরু রিপোর্টের প্রতিবাদে জিন্নাহ ১৪ দফা দাবি (১৯২৯) পেশ করেন।
হিন্দু মহাসভাও মুসলিমদের জন্য আসন সংরক্ষণের কিছু ধারার বিরোধিতা করেছিল।
সর্বসম্মতি না মেলায় লর্ড আরউইন এই রিপোর্ট সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
এই রিপোর্টের ব্যর্থতার পরেই ১৯২৯ সালে ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশন ও পূর্ণ স্বরাজের ডাক দেওয়া হয়।
এটি ছিল ভারতীয়দের দ্বারা তৈরি ভারতের প্রথম খসড়া সংবিধান।
Previous Year Questions-এর ধাঁচে গুরুত্বপূর্ণ Facts:
ইন্ডিপেন্ডেন্স ফর ইন্ডিয়া লীগ (Independence for India League): নেহরু রিপোর্টের 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'-এর লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ১৯২৮ সালে জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু যৌথভাবে এই লিগ গঠন করেন, যা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসারে কাজ করেছিল।
লখনউ সর্বদলীয় সম্মেলন (আগস্ট ১৯২৮): এই সম্মেলনেই নেহরু রিপোর্টটি সর্বসমক্ষে পাঠ করা হয় এবং প্রাথমিক অনুমোদন পায়।
কোন শিখ নেতা নেহরু কমিটির সদস্য ছিলেন? সর্দার মঙ্গল সিং এই কমিটিতে শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
নেহরু কমিটির খসড়া সংবিধান তৈরিতে উদারপন্থী বা লিবারেল ফেডারেশনের প্রতিনিধি কে ছিলেন?" উত্তর: তেজ বাহাদুর সপ্রু।
নেহরু রিপোর্টে ভোটাধিকারের বয়স কত নির্ধারণ করা হয়েছিল? উত্তর: ২১ বছর (মনে রাখবেন, বর্তমানে এটি ১৮ বছর, যা ৬১তম সংশোধনী আইন ১৯৮৯ দ্বারা করা হয়েছে)।
কোন অধিবেশনে নেহরু রিপোর্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল? উত্তর: ১৯২৮ সালের আগস্টের লখনউ সর্বদলীয় সম্মেলন এবং পরবর্তীতে ডিসেম্বরের কলকাতা অধিবেশনে।
Confusing Facts (বিভ্রান্তিকর তথ্যের তুলনা):
নেহরু রিপোর্ট বনারস কংগ্রেস বনাম সর্বদলীয় সম্মেলন: নেহরু রিপোর্ট কোনো একক দলের তৈরি ছিল না। কংগ্রেস উদ্যোগ নিলেও এটি ছিল একটি সর্বদলীয় কমিটির (All Parties Committee) যৌথ দলিল।
অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers): নেহরু রিপোর্টে অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখার কথা বলা হয়েছিল (যা কানাডার সংবিধানের মতো)। কিন্তু জিন্নাহর ১৪ দফায় অবশিষ্ট ক্ষমতা প্রদেশের হাতে রাখার দাবি জানানো হয়েছিল (আমেরিকার সংবিধানের মতো)।
বিভ্রান্তিকর বিষয় | নেহরু রিপোর্ট (1928) এর অবস্থান | জিন্নাহর ১৪ দফা (1929) / মুসলিম লীগের অবস্থান |
অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) | কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়। | প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করার দাবি জানানো হয়। |
নির্বাচন মণ্ডলী (Electorate) | পৃথক নির্বাচন বাতিল করে যৌথ নির্বাচন (Joint Electorate) প্রবর্তন। | পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী (Separate Electorates) বজায় রাখার দাবি। |
কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম আসন | জনসংখ্যার অনুপাতে আসন সংরক্ষণ (১/৩ অংশ নির্দিষ্ট নয়)। | কেন্দ্রীয় আইনসভায় স্পষ্ট ১/৩ অংশ (One-third) মুসলিম আসন দাবি। |
সিন্ধু প্রদেশ গঠন | বোম্বাই থেকে সিন্ধুকে আলাদা করার কথা বলা হলেও তা ডোমিনিয়ন পাওয়ার পর কার্যকর করার শর্ত ছিল। | অবিলম্বে সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে পৃথক করে সম্পূর্ণ মুসলিম প্রধান প্রদেশ গঠনের দাবি। |