সিন্ধু সভ্যতা |
সিন্ধু নদ ও তার উপনদগুলির উভয় তীরে খ্রিস্টপূর্ব 3000 অব্দে তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাই সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত।
• সিন্ধু সভ্যতাতে প্রথম আবিষ্কৃত স্থানের নাম হরপ্পা, তাই সিন্ধু সভ্যতাকে হরপ্পা সভ্যতাও বলা হয়ে থাকে।
• আবার হরপ্পা সভ্যতাকে অনেকের সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতা বলেও বর্ণনা করে থাকেন।
আবিষ্কারক: বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার জন মার্শালের নেতৃত্বে হাজার 1921 সালে দয়ারাম সাহানি প্রথম হরপ্পা
সভ্যতার আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে 1922 সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন।
Note: স্যার জন মার্শাল ছিলেন তৎকালীন সময়ে ASI (Archeological Survey of India)- এর অধিকর্তা। ASI এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম।
সভ্যতার সময়কাল:- হরপ্পা সভ্যতাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
1. প্রাক হরপ্পা- 3200-2600 BC
2. পরিপূর্ণ হরপ্পা- 2600-1900 BC
3. উত্তর হরপ্পা- 1900-1300 BC
তবে হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল বললে আমরা মূলত 2300 থেকে 1750 খ্রিষ্টপূর্বাব্দকেই বুঝি।
· প্রায় 1550 কিমি পরিধি সহকারে বিস্তৃত ছিল এই সভ্যতা। উত্তরে মান্ডা (জম্বু কাশ্মীর) দক্ষিনে মালভান (মহারাষ্ট্র) পূর্বে আলমগীর পুর (উত্তর প্রদেশ) পশ্চিমে সুতাকাজেন্ডোর (বালুচিস্থান) পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। পূর্ব থেকে পশ্চিমে 1100 কিমি এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে 1600 কিমি পরিধি নিয়ে হরপ্পা সংস্কৃতির বিস্তৃত ছিল।
· সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি:--
দিক | স্থান | বর্তমান অবস্থান | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
|---|
উত্তর | মান্ডা (Manda) | জম্মু ও কাশ্মীর | চেনাব নদীর তীরে |
দক্ষিণ | দাইমাবাদ (Daimabad) | মহারাষ্ট্র | গোদাবরী নদী অববাহিকা |
পূর্ব | আলমগীরপুর (Alamgirpur) | উত্তরপ্রদেশ | হিন্দন নদীর তীরে |
পশ্চিম | সুতকাগেনদোর (Sutkagendor) | বালুচিস্তান, পাকিস্তান | মাকরান উপকূলের কাছে |
সিন্ধু সভ্যতার মূল কেন্দ্রগুলি বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। প্রধান দুই কেন্দ্র হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত।
প্রথম কৃষিজীবী গোষ্ঠীর সন্ধানও পাওয়া যায় পাকিস্তানে-বালুচিস্তানের বোলান গিরিখাদের কাছে মেহেরগড়ে।
সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার সময়কালকে চারটি পর্বে ভাগ করা যায়।
১) হরপ্পা আদি পর্যায়-মেহেরগড়।
২) খড়গপুর পরিণত পর্যায়-আমরি
৩) হরপ্পার পরিণত পরবর্তী পর্যায়-কালিবঙ্গান
৪) হরপ্পার অন্তিম পর্যায়-লোথাল
উপরের কেন্দ্রগুলি ছাড়াও এই সভ্যতার অসংখ্য কেন্দ্র ভারত পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাওয়া গেছে।
Ø মাকরান উপকূলের নিকটবর্তী সুতকাজেন্দর- পশ্চিম সীমান্ত।
Ø উত্তরপ্রদেশের আলমগীরপুর- পূর্ব সীমান্ত।
Ø জম্মুর অন্তর্গত মান্ডা-উত্তর সীমান্ত।
Ø মহারাষ্ট্রের দায়মাবাদ-দক্ষিণ সীমান্ত।
নৃতাত্ত্বিকেরা হরপ্পাবাসিকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন:
১) প্রোটো অস্ট্রোলয়েড
২) ভূমধ্যসাগরীয় বা মেডিটেরিয়ান
৩) অ্যালপাইন
৪) মঙ্গোলয়েড
Ø সিন্ধু সভ্যতার রাজধানী ছিল হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো।
Ø এই সভ্যতার বন্দর গুলি হল লোথাল, শুটকাজেন্দর বালাকোট।
মহেঞ্জোদাড়ো (সিন্ধু)
• মহেঞ্জোদাড়ো শহরটির প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একটি বৃহৎ স্নানাগার ছিল যা 39 ফুট লম্বা 23 ফুট চওড়া এবং ৪ ফুট গভীর ছিল। স্নানাগারটির নিকটবর্তী একটি নগর দুর্গ ছিল, যার ইটের নির্মাণকার্য ছিল লক্ষণীয়। এর মেঝে নির্মিত হয়েছিল পোড়া ইটের দ্বারা।
এই শহরটির অন্যান্য অট্টালিকা সমূহের পাশাপাশি ছিল একটি আয়তাকার সভাঘর। তৎসহ ছিল আরো একটি আয়তাকার বৃহৎ অট্টালিকা, যা মূলত সেবা কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।
• মহেঞ্জোদারো শহরটি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে পশুপতির সীলমোহর। ব্রোঞ্জ ধাতুর তৈরি একটি বালিকার নৃত্যরত মূর্তি, তিনটি নলাকার সীলমোহর।
হরপ্পা (পাকিস্তানের পাঞ্জাব):-
এটি হলো সিন্ধু সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহর যা 1921 খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেন দয়ারাম সাহানি।
• সিন্ধু সভ্যতা মূলত হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিতি লাভ করে, এই সভ্যতায় সর্বপ্রথম হরপ্পা স্থানটি আবিষ্কৃত হবার পর।
হরপ্পা শহরটি থেকে বৃহৎ শস্যাগার প্রাপ্ত হয়েছে যা ছিল একটি নগরদীপের নিকটবর্তী।
• হরপ্পা শহরটির অবস্থান লক্ষ্য করে কতিপয় ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন যে, এটি ছিল শহরের প্রবেশদ্বার।
এই শহরটি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে-একাধিক কুমারী দেবী (সীলমোহর), কাঠের পাত্রে গম ও কেটলি এবং আয়না, নগ্ন পুরুষ ও নারীর নৃত্যরত মূর্তি (পাথর)।
ধোলাভিরা (গুজরাট)
• সিন্ধু সভ্যতার সর্বাধুনিক শহরটি হল ধোলাভিরা। ভারতবর্ষে সিন্ধুসভ্যতার সর্ববৃহৎ শহরের সংখ্যা একটি অথবা দুটি। যার মধ্যে ধোলাভিরা অন্যতম। তাছাড়া এই সভ্যতার অন্য শহরটি হল হরিয়ানার রাখিগারহি।
· এই ধোলাভিরা অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি দুটি নয় তিনটি অংশে বিভক্ত। যার দুটি অংশ সুগঠিত হয়েছিল পাথরের আয়তাকার গঠন দ্বারা। যা ছিল সিন্ধু সভ্যতার পণ্য বিক্রয়ের ঘর।
লোথাল (গুজরাট)
লোথাল শহরটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল--এটি ছিল একটি বন্দর বা পোতাশ্রয়। পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক বন্দর ছিল লোথাল (সিন্ধু সভ্যতার প্রধান সামুদ্রিক বন্দর রূপে পরিচিত)
তাছাড়া সিন্ধু সভ্যতার একমাত্র যে অঞ্চল থেকে ধানের তুষ প্রাপ্ত হয়েছে, তা হল-আমেদাবাদের নিকটবর্তী রংপুর)।
লোথাল এবং কালিবঙ্গান অঞ্চল দুটি থেকেই পুজা বেদি প্রাপ্ত হয়েছে।
লোথাল পরিচিত ছিল সিন্ধু সভ্যতার ম্যাঞ্চেস্টার নগর নামে। কারণ বস্ত্র বাণিজ্য এখানে বিখ্যাত ছিল।
কালিবঙ্গান (রাজস্থান)
সাহিত্যগত দিক থেকে কালিবঙ্গান শব্দটির অর্থ ব্ল্যাক ব্যাঙ্গেল বা কালো কঙ্কণ। এই অঞ্চল থেকে কোনো দেবিকা মূর্তি প্রাপ্ত হয়নি এখান থেকে প্রাচীনতম লাঙ্গল বা কর্ষণকৃত জমি।সাতটি যজ্ঞবেদী এবং পশুচালিত চাকার গাড়ির খেলনা প্রাপ্ত হয়।
চানহুদাড়ো সিন্ধু:-
• চানহুদাড়ো শহরটিতে ভারতের ল্যাঙ্কালিয়ার বলা হয়। এটি একমাত্র শহর যাতে কোনো নগর দুর্গ-র অস্তিত্ব নেই।
এই শহর থেকে একটি ছোটো পাত্র প্রাপ্ত হয়। মনে করা হয় এটি ছিল একটি কালির দোয়াত। তবে এই বিষয়টি চূড়ান্ত রূপে স্বীকৃত নয়।
• এখান থেকে চালক দ্বারা পরিচালিত পশুর গাড়ি এবং ইটের উপর কুকুরের ছাপ মেলে।
সুকটাজেন্দর
পাকিস্তান-ইরান সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশে সুটকাজেন্দর অবস্থিত। এটি সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত। এই নগরটিতে দুর্গের উপস্থিতি ছিল এবং নগরটি 30 ফুট প্রশস্ত পাঁচিল দ্বারা ঘেরা ছিল।
• সুটকাজেন্দর নগরটি গুজরাটের লোথাল থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সুদীর্ঘ বানিজ্যপথে অবস্থিত ছিল।
দাইমাবাদ:-
• 1958 সালে আবিষ্কৃত সিন্ধু সভ্যতার এই নগরটি মহারাষ্ট্রের মুম্বাই-এর কাছে অবস্থিত। এই নগরটির
সিন্ধু সভ্যতায় উপস্থিতি ছিল কিনা তাই নিয়ে নৃতত্ত্ববিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে।
এখান থেকে রথচালক দ্বারা পরিচালিত রথের ব্রোঞ্জের ছবি সহ ষাঁড়, হাতি, গন্ডারের মূর্তি প্রাপ্ত হয়।
কোটডিজি:-
1958 সালে এফ. এ. খান কর্তৃক আবিষ্কৃত কোট ডিজি সিন্ধু নদের পূর্ব তীরে একটি পাথর নির্মিত পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।কোটডিজির নগর পরিকল্পনায় দুর্গ এবং নিচু শহরের পরিচয় পাই। ঐতিহাসিকরা এটিকে প্রাক হরপ্পা যুগীয় অঞ্চল বলে দাবি করেছেন। এখানে বাড়িগুলি পোড়া ইট এবং টেরাকোটা শিল্প রীতির দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে পাথরের ব্যবহৃত জিনিসসহ পাথর নির্মিত তীরের মাথা প্রাপ্ত হয়েছে।
নগর পরিকল্পনা এবং গঠন :-
সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা ছিল অপরিকল্পিত। এই সভ্যতার নগর পরিকল্পনার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল- জলের দ্বারা বাহিত আবর্জনাকে আটকাবার জন্য নর্দমার মধ্যে ঝাঁজরি থাকতো। তাছাড়া নগরের রাস্তাগুলি একে অপরকে সমকোণে সংযুক্ত থাকতো। এমনকি এই সভ্যতার নগরগুলি দুটি আয়তাকার ব্লকে বিভক্ত
• নগরগুলি দুটি খণ্ডে বিভক্ত থাকতো, যথা-উপরের অংশ বা সিটাডেল বা নগর দুর্গ এবং নিম্ন অংশ।
· সিটাডেলগুলি নগরের পশ্চিমাংশে ছিল।সেখানকার অট্টালিকাসমূহে শাসক শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করত।
• অন্যদিকে সিটাডেলের নিম্নাংশে অর্থাৎ নগরের পূর্ব প্রান্তের অট্টালিকা সমূহে সাধারণ শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করত।
• নগরের অট্টালিকাগুলি দোতলা অথবা তারও বেশি তল বিশিষ্ট হত। সাধারণ বাড়িগুলির প্রবেশদ্বার পাশের দিকে থাকতো। এমনকি বাড়িগুলির সামনের দিকে কোনো জানালা থাকত না।
• নগরগুলি অধিকমাত্রায় পোড়া ইটের অট্টালিকা প্রাপ্ত হলেও সম্পূর্ণরূপে পাথর নির্মিত অট্টালিকা অনুপস্থিত ছিল।
• ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থায় নগরের সমস্ত অট্টালিকা সমূহের নালাগুলি বড়ো রাস্তার নর্দমায় পতিত হত। নর্দমাগুলিকে ইট বা পাথরের ঢাকনা দ্বারা চাপা দেওয়া থাকত। তৎসহ সজ্জিত ম্যানহোল ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। নর্দমাগুলিতে চুন দেওয়া হত। তাই বলা যায় সিন্ধু বাসিরা ছিল স্বাস্থ্যসচেতন।
বৃহৎ স্নানাগার (মহেঞ্জোদাড়ো):-এই স্নানাগারটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। স্নানাগারটির উভয় প্রান্ত থেকে সিঁড়ির ধাপ তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৎসহ স্নানাগারটির মধ্যে জল ভরার জন্য নল এবং জল
নিষ্কাশন এর জন্য পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল।
বৃহৎ শস্যাগার (হরপ্পা):-হরপ্পার সিটাডেল বা নগর দুর্গগুলি সংলগ্ন সারিবদ্ধ ছয়টি শস্যাগার ছিল।
সামাজিক জীবন :-
• কার্যের উপর ভিত্তি করে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত ছিল। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ এই হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
• জাতিভেদ প্রথা কিংবা বর্ণ প্রথার প্রচলন ছিল না। পন্ডিতরা অনুমান করেন এই শহরে ক্রীতদাস ছিল। তারা মূলত শহরের জঞ্জাল পরিষ্কার, ভারী বোঝা বহন প্রভৃতি কাজগুলো করে থাকতো
• হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের ফলমূল, তিল, খেজুর, গম, বার্লি, যব, ভাত, শাকসবজি, মুরগি, ভেড়া, গরু, বিভিন্ন পশু-পাখির মাংস, দুধ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতো। এছাড়া মাছ শিকারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• পোশাক হিসেবে পশম এবং সুতিবস্ত্র উভয়ই ব্যবহার করত। দুই খন্ড পোশাক দ্বারা শরীর আচ্ছাদিত থাকতো। উপরের অংশের বস্ত্রকে বলা হতো নিবি এবং নিম্নাঙ্গের কাকে বলা হত পরিধান।
• ছেলে ও মেয়ে উভয়েই অলংকার ব্যবহার করত। মেয়েরা সোনা ও রুপোর ফিতে দিয়ে নানা ধরনের খোপা করতো। এছাড়া নানা ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী, সুগন্ধি এমনকি সুরমার ব্যবহারও তারা জানতো।
• গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে গরু, মোষ, ভেড়া, ছাগল, ছিল উল্লেখযোগ্য।
• তাম্র প্রস্তর যুগের এই মানুষেরা তামা, ব্রোঞ্চ ও পাথরের তৈরি কুঠার, তির-ধনুক, বর্শা প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করত। তবে আত্মরক্ষামূলক কোন অস্ত্র যেমন-ঢাল, শিরস্ত্রানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের অবসরে বিনোদনের মূল উপায় ছিল পাশা খেলা, রথচালনা, ষাঁড়ের লড়াই, শিকার, নৃত্যগীতি প্রভৃতি। জুয়া খেলা ছিল খুব জনপ্রিয়।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের দাহ করা এবং কবর দেওয়া উভয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• কুমোরের চাকার সাহায্যে বিভিন্ন মৃৎপাত্র তৈরি করা হতো এইসময়। এগুলো ছিল মূলত উজ্জ্বল বা কালচে লাল রঙের। খুব ভালোভাবে পুড়িয়ে এর গায়ে বিভিন্ন লিপি প্রদান করা হতো।
ধর্মীয় জীবন :-
মেসোপটেমিয়া মিশরীয় সভ্যতার সাথে সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় জীবনের অনেক মিল পাওয়া যায়।
• হরপ্পা সভ্যতা ছিল মূলত মাতৃতান্ত্রিক সভ্যতা।
• প্রাকৃতিক কোন জিনিসের পুজো করতে দেখা যায়নি।
• সূর্য উপাসনার প্রচলন ছিল বলে ধারণা করা হয়।
• পুরুষ শক্তির প্রতীক ছিল পশুপতি শিব (ত্রিমুখ বিশিষ্ট ধ্যানরত একযোগী মুর্তী)।
• মূর্তিটি পাঁচটি পশু দ্বারা পরিবৃত থাকতো বাঘ, মোষ, হাতি, গন্ডার, হরিণ।
· . নারী শক্তির প্রতীক হলো জঠরের মধ্যে থেকে গাছের উৎপত্তি।
রাজনৈতিক জীবন :-
হরপ্পা সভ্যতার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন মত প্রদান করেছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে এই সভ্যতার মূলে একটি কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল নতুবা এত পরিকল্পিত ও উন্নত নগর সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব হতো না। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন বণিক দ্বারা পরিচালিত একটি প্রজাতান্ত্রিক শাসন এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
কৃষিকার্য :-
• হরপ্পা সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল কৃষিকাজ। মনে করা হয় পৃথিবীর মধ্যে প্রথম তুলা চাষ করেন এই হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরাই।
• এছাড়া ধান, যব, বার্লি, বিভিন্ন ফল, মুগ, গম প্রভৃতি চাষ করত।
• সেচ ব্যবস্থার নিদর্শন ও লাঙলের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ব্যবসা বাণিজ্য :-
• ব্যবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধি হরপ্পা সভ্যতা বিকাশের অন্যতম কারণ।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা যে ব্যবসা বাণিজ্য করতো তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মূলত মেসোপটেমিয়া, আফগানিস্তান, সুমের প্রভৃতি দেশের সাথে স্থল ও জলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে। মিশরের সঙ্গে এখানকার অধিবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• মূল রপ্তানি দ্রব্য ছিল তুলা ও সুতির বস্ত্র, হাতির দাঁতের জিনিসপত্র এবং আমদানি করা হতো বিভিন্ন ধাতু যেমন সোনা, রূপা, তামা, জেড পাথর শঙ্খ প্রভৃতি
• বিনিময় প্রথার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো।
নগর পরিকল্পনা:-
• হরপ্পা সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা এবং এই সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তার নগর পরিকল্পনা। সমকালীন পরিস্থিতিতে এত উন্নত নগর পরিকল্পনা পৃথিবীর আর কোন দেশে দেখা যায়নি।
• নগর মূলত দু'ভাগে বিভক্ত ছিল উচ্চ অংশ এবং নিম্ন অংশ। উঁচু স্থানে তৈরি হতো দুর্গ ও উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের বাসস্থান এবং নিম্ন অংশে থাকতো সাধারণ মানুষ।
• পোড়া ইটের ব্যবহার লক্ষণীয়।
• পাকা নর্দমার নিদর্শন দেখতে পাওয়া গেছে। এবং নর্দমা গুলি ঢাকা থাকতো।
• নগরের মূল রাস্তা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত থাকতো।
· . প্রতিটি বাড়িতে ডিম্বাকার কূপের ব্যবস্থা ছিল।
Note:
• মহেঞ্জোদারোতে বৃহৎ স্নানাগারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। মূলত ধর্মীয় কারণে সর্বসাধারণের জন্য নির্মিত হয়েছিল এই স্নানাগার। এর বাইরের আয়তন ছিল 180×108 বর্গফুট এবং ভেতরের আয়তন ছিল 39×23×৪ ঘনফুট।
• রাজস্থানের গঙ্গা নগরে ঘর্ঘরা নদীর তীরে মহেঞ্জোদারোর পশ্চিম দিকে কালিবঙ্গান নামক স্থানে 40 ফুট উঁচু ঢিবির ওপর 169×135 বর্গফুট মাপের একটি বৃহৎ শস্যাগার এর সন্ধান পাওয়া গেছে।
• এছাড়া হরপ্পাতে ছয়টি সারিবদ্ধ শস্যাগার দেখা গেছে। দুর্গের বাইরেও শস্যাগার তৈরি করা হতো।
প্রযুক্তি ও দক্ষতা:-
• হরপ্পাবাসিরা পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করত। তারা এই সময়ে ব্রোঞ্জের সহিত পরিচিত হয়। যা অধিকাংশই তৈরি হতো তামা এবং টিনের সংমিশ্রণে।
• সিন্ধু সভ্যতায় নৌকা তৈরি, ব্রোঞ্জের অলংকার এবং মৃৎপাত্রে চিত্রাংকন (লাল এবং কালো) করা হত।
কুমোরের চাকা সম্পূর্ণ মাত্রায় এই সভ্যতায় ব্যবহৃত হত।
হরপ্পার সিলমোহর:-
• সিন্ধুর সীলমোহরগুলি সাধারণত স্লেট পাথর (নরম পাথর) দ্বারা নির্মিত হতো।
• সিন্ধু সভ্যতার সীলমোহরগুলি কাটার পদ্ধতি এবং মসৃণতার জন্য তা সাদা উজ্জ্বল হয়ে উঠত। যা ছিল সিন্ধু সভ্যতার এক অভূতপূর্ব আবিষ্কার।।
• এই সভ্যতার অধিকাংশ সিলমোহরে পশুর ছবি খোদাই করা হত। তাতে অল্প কিছু লিপি খোদিত হত।
• সিন্ধু সভ্যতার একাধিক সিলমোহরে একশৃঙ্গ বিশিষ্ট ঘোড়ার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাছাড়া মহেঞ্জোদারো থেকে বিখ্যাত ষাঁড়ের চিত্রযুক্ত সীলমোহর প্রাপ্ত হয়।
প্রধান ধরন:-১) বর্গাকৃতির সীলমোহর গুলিতে এক খন্ড পশুর ছবির পাশাপাশি কিছু লিপি লেখা থাকত। ২) আয়তাকৃতির সীলমোহর গুলিতে শুধুমাত্র লিপি খোদিত থাকত।
সিন্ধু সভ্যতাতে বর্তমানে 100 টিরও বেশী শহর আবিষ্কৃত হয়েছে। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলঃ হরপ্পা,
মহেঞ্জোদারো, কালিবঙ্গান, লোখাল, চানহুদারো, কোটদিজি, রংপুর, রাখিগারী প্রভৃতি।
• মহেঞ্জোদারো কথার অর্থ মৃতের স্তুপ।
লোথাল কথার অর্থ মৃতের স্থান।
• হরপ্পা কথার অর্থ পশুপতির খাদ্য।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা ঘোড়ার ব্যবহার জানত না। তবুও ব্যতিক্রমীকভাবে ধোলাভিড়ায় ঘোড়ার নিদর্শন পাওয়া গেছে।
• লোথাল এ পৃথিবীর প্রাচীনতম জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র ও প্রাচীনতম সমুদ্র বন্দরের নিদর্শন পাওয়া গেছে।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা মূলত বলদে টানা গাড়িতে যাতায়াত করতো। এছাড়া কিছু জায়গায় নৌকার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
সিন্ধু সভ্যতার নামকরণ হরপ্পা সভ্যতা হল কেন?
সুপ্রাচীন সভ্যতার সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত স্থলটি সিন্ধু নদের তীরবর্তী অঞ্চলে হওয়ায় এটি সুদীর্ঘকাল যাবত সিন্ধু সভ্যতা নামেই সমধিক পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সিন্ধুতট অতিক্রম করে ভারত ও ভারতের বাইরে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় 1500 টি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া মহেঞ্জোদারোর তুলনায় হরপ্পায় প্রাপ্ত নিদর্শনগুলির অনেক বেশি প্রাচীন ও মহেঞ্জোদারো অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ববিদগণের নিকট এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে সুপরিচিত।
হরপ্পা সভ্যতা পতনের কারণ:-
হরপ্পাবাসীর রক্ষণশীল মানসিকতার এই সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। নতুন কিছু শিখতে চাওয়ার অনীহা এই সভ্যতাকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।
বন্যা ও খরা প্রকোপে নগর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
• নগর কেন্দ্রিকতা ভেঙে পড়ে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণের ফলে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
হরপ্পা সভ্যতার প্রভাব :- ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর হরপ্পা সভ্যতায় প্রভাব ছিল ব্যাপক। হরপ্পা সভ্যতাই
প্রাচীনতম সভ্যতা। মনে করা হয় হিন্দু ধর্মে মূর্তি পূজা, প্রতীক উপাসনা, শিবলিঙ্গ পূজা, বলিদান প্রথা সবই হরপ্পা সভ্যতার অবদান।
Note: সিন্ধুরা লোহার ব্যবহার জানত না এবং আত্মরক্ষামূলক অস্ত্রের ব্যবহার জানত না। অন্যদিকে আর্যরা লোহার অস্ত্র, ঘোড়া, ঢাল, বর্ম নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল যার ফলে আর্যদের জয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন উঠতে পারে আক্রমণকারীরা কি আর্যই ছিল?
> আর্যদের মতে ইন্দ্রের অপর নাম 'পুরন্দর' যার অর্থ নগর ধ্বংসকারী। আর সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি নগর সভ্যতা।
ONELINER NOTE |
সিন্ধুসভ্যতায় প্রথম ধানের চাষ লোথালে হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
লোথাল ছিল বন্দরনগরী, এখানে পোতাশ্রয়ের অস্তিত্ব ছিল
ছাড়াও হরপ্পা, কালিবঙ্গান, রংপুরে ধানের চাষ হত বলে মনে করা হয়।
চানহুদারো ছিল একমাত্র স্থান যেটি ছিল কোনোপ্রকার দুর্গবিহীন। অর্থাৎ এখানে কোনো দুর্গ ছিল না।
জলনিকাশি ব্যবস্থা সর্বাপেক্ষা সুন্দর ছিল চানহুদারোতে।
কালিবঙ্গানে জলনিকাশি ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল।
হরপ্পা সভ্যতায় রাখিগড়াই অঞ্চলে মেয়েদের জন্য পৃথক সমাধিক্ষেত্রের কথা জানা যায়।
কালিবঙ্গানে আবিষ্কৃত একটি বিশিষ্ট নিদর্শন হল একটি চষাক্ষেত্রের অস্তিত্ব, হরপ্পা সভ্যতায় হরপ্পাকে ‘প্রবেশদ্বার' আখ্যা দেওয়া হয়। এখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিলমোহর মিলেছে।
ভারতের সীমান্তভুক্ত বৃহত্তম হরপ্পা সভ্যতার কেন্দ্রস্থল দুটি হল – ঢোলাভিরা (গুজরাট) এবং রাখিগড়ি (হরিয়ানা)
হরপ্পার সিলে প্রদত্ত পুরুষ দেবতাকে স্যার জন মার্শাল পশুপতি শিব এবং ব্যাসাম 'আদি শিব' বলে মনে করেন।
কালিবঙ্গানে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ছিল কাঁচা ইটের তৈরি।
মৃতদেহকে সাধারণত কবরস্থানের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে শায়িত করার নিয়ম ছিল। শবের মাথা উত্তর দিকে রাখা হত।
মহেঞ্জোদাড়ো শহরের পশ্চিম এলাকায় আর্নেস্ট ম্যাকে একটি বৃহৎ আকৃতির বাড়িকে 'কলেজ বাড়ি' আখ্যা দেন এবং স্যার জন মার্শা এখানেই আরেকটি বাড়িকে “সভাগৃহ” বলে বর্ণনা করেছেন। এটিই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম হলঘরের ধ্বংসাবশেষ।
হরপ্পাবাসী ভক্তিবাদ, জন্মান্তরবাদে এবং পরলোকে বিশ্বাসী
হরপ্পাবাসীদের ধর্মবিশ্বাসে মন্দির বা দেবালয়ের কোনো স্থান ছিল না বলেই মনে করা হয়।
হরপ্পায় প্রাপ্ত এক সিলমোহরে পা তোলা ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান নারীর উদর থেকে এক চারগাছ বের হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। কিছু ঐতিহাসিকদে অনুমান এটি ভূমাতার মূর্তি,
হরপ্পায় বাড়িগুলি পোড়া ইটের তৈরি হত।
লোথাল শব্দের অর্থ মৃতের স্থান। হরপ্পা সভ্যতায় লোথাল ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম বন্দর বা পোতাশ্রয়।
রাস্তা তৈরিতে চুন, সুড়কি জাতীয় জিনিস ও পাথর ব্যবহৃত হত।
হরপ্পাবাসীরা তামা, ব্রোঞ্জ ও পাথরের তৈরি কুঠার, বর্শা, তির, ধনুক, মুষল, কাস্তে প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করত। সিন্ধু সভ্যতায় ঢাল, বা শিরস্ত্রাণ প্রভৃতি আত্মরক্ষামূলক অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি।
বস্ত্রবয়ন শিল্প ছিল হরপ্পার প্রধান শিল্প।
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
সিন্ধু সভ্যতা |
সিন্ধু নদ ও তার উপনদগুলির উভয় তীরে খ্রিস্টপূর্ব 3000 অব্দে তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাই সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত।
• সিন্ধু সভ্যতাতে প্রথম আবিষ্কৃত স্থানের নাম হরপ্পা, তাই সিন্ধু সভ্যতাকে হরপ্পা সভ্যতাও বলা হয়ে থাকে।
• আবার হরপ্পা সভ্যতাকে অনেকের সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতা বলেও বর্ণনা করে থাকেন।
আবিষ্কারক: বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার জন মার্শালের নেতৃত্বে হাজার 1921 সালে দয়ারাম সাহানি প্রথম হরপ্পা
সভ্যতার আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে 1922 সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন।
Note: স্যার জন মার্শাল ছিলেন তৎকালীন সময়ে ASI (Archeological Survey of India)- এর অধিকর্তা। ASI এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম।
সভ্যতার সময়কাল:- হরপ্পা সভ্যতাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
1. প্রাক হরপ্পা- 3200-2600 BC
2. পরিপূর্ণ হরপ্পা- 2600-1900 BC
3. উত্তর হরপ্পা- 1900-1300 BC
তবে হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল বললে আমরা মূলত 2300 থেকে 1750 খ্রিষ্টপূর্বাব্দকেই বুঝি।
· প্রায় 1550 কিমি পরিধি সহকারে বিস্তৃত ছিল এই সভ্যতা। উত্তরে মান্ডা (জম্বু কাশ্মীর) দক্ষিনে মালভান (মহারাষ্ট্র) পূর্বে আলমগীর পুর (উত্তর প্রদেশ) পশ্চিমে সুতাকাজেন্ডোর (বালুচিস্থান) পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। পূর্ব থেকে পশ্চিমে 1100 কিমি এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে 1600 কিমি পরিধি নিয়ে হরপ্পা সংস্কৃতির বিস্তৃত ছিল।
· সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি:--
দিক | স্থান | বর্তমান অবস্থান | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
|---|
উত্তর | মান্ডা (Manda) | জম্মু ও কাশ্মীর | চেনাব নদীর তীরে |
দক্ষিণ | দাইমাবাদ (Daimabad) | মহারাষ্ট্র | গোদাবরী নদী অববাহিকা |
পূর্ব | আলমগীরপুর (Alamgirpur) | উত্তরপ্রদেশ | হিন্দন নদীর তীরে |
পশ্চিম | সুতকাগেনদোর (Sutkagendor) | বালুচিস্তান, পাকিস্তান | মাকরান উপকূলের কাছে |
সিন্ধু সভ্যতার মূল কেন্দ্রগুলি বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। প্রধান দুই কেন্দ্র হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত।
প্রথম কৃষিজীবী গোষ্ঠীর সন্ধানও পাওয়া যায় পাকিস্তানে-বালুচিস্তানের বোলান গিরিখাদের কাছে মেহেরগড়ে।
সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার সময়কালকে চারটি পর্বে ভাগ করা যায়।
১) হরপ্পা আদি পর্যায়-মেহেরগড়।
২) খড়গপুর পরিণত পর্যায়-আমরি
৩) হরপ্পার পরিণত পরবর্তী পর্যায়-কালিবঙ্গান
৪) হরপ্পার অন্তিম পর্যায়-লোথাল
উপরের কেন্দ্রগুলি ছাড়াও এই সভ্যতার অসংখ্য কেন্দ্র ভারত পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাওয়া গেছে।
Ø মাকরান উপকূলের নিকটবর্তী সুতকাজেন্দর- পশ্চিম সীমান্ত।
Ø উত্তরপ্রদেশের আলমগীরপুর- পূর্ব সীমান্ত।
Ø জম্মুর অন্তর্গত মান্ডা-উত্তর সীমান্ত।
Ø মহারাষ্ট্রের দায়মাবাদ-দক্ষিণ সীমান্ত।
নৃতাত্ত্বিকেরা হরপ্পাবাসিকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন:
১) প্রোটো অস্ট্রোলয়েড
২) ভূমধ্যসাগরীয় বা মেডিটেরিয়ান
৩) অ্যালপাইন
৪) মঙ্গোলয়েড
Ø সিন্ধু সভ্যতার রাজধানী ছিল হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো।
Ø এই সভ্যতার বন্দর গুলি হল লোথাল, শুটকাজেন্দর বালাকোট।
মহেঞ্জোদাড়ো (সিন্ধু)
• মহেঞ্জোদাড়ো শহরটির প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একটি বৃহৎ স্নানাগার ছিল যা 39 ফুট লম্বা 23 ফুট চওড়া এবং ৪ ফুট গভীর ছিল। স্নানাগারটির নিকটবর্তী একটি নগর দুর্গ ছিল, যার ইটের নির্মাণকার্য ছিল লক্ষণীয়। এর মেঝে নির্মিত হয়েছিল পোড়া ইটের দ্বারা।
এই শহরটির অন্যান্য অট্টালিকা সমূহের পাশাপাশি ছিল একটি আয়তাকার সভাঘর। তৎসহ ছিল আরো একটি আয়তাকার বৃহৎ অট্টালিকা, যা মূলত সেবা কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।
• মহেঞ্জোদারো শহরটি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে পশুপতির সীলমোহর। ব্রোঞ্জ ধাতুর তৈরি একটি বালিকার নৃত্যরত মূর্তি, তিনটি নলাকার সীলমোহর।
হরপ্পা (পাকিস্তানের পাঞ্জাব):-
এটি হলো সিন্ধু সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহর যা 1921 খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেন দয়ারাম সাহানি।
• সিন্ধু সভ্যতা মূলত হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিতি লাভ করে, এই সভ্যতায় সর্বপ্রথম হরপ্পা স্থানটি আবিষ্কৃত হবার পর।
হরপ্পা শহরটি থেকে বৃহৎ শস্যাগার প্রাপ্ত হয়েছে যা ছিল একটি নগরদীপের নিকটবর্তী।
• হরপ্পা শহরটির অবস্থান লক্ষ্য করে কতিপয় ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন যে, এটি ছিল শহরের প্রবেশদ্বার।
এই শহরটি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে-একাধিক কুমারী দেবী (সীলমোহর), কাঠের পাত্রে গম ও কেটলি এবং আয়না, নগ্ন পুরুষ ও নারীর নৃত্যরত মূর্তি (পাথর)।
ধোলাভিরা (গুজরাট)
• সিন্ধু সভ্যতার সর্বাধুনিক শহরটি হল ধোলাভিরা। ভারতবর্ষে সিন্ধুসভ্যতার সর্ববৃহৎ শহরের সংখ্যা একটি অথবা দুটি। যার মধ্যে ধোলাভিরা অন্যতম। তাছাড়া এই সভ্যতার অন্য শহরটি হল হরিয়ানার রাখিগারহি।
· এই ধোলাভিরা অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি দুটি নয় তিনটি অংশে বিভক্ত। যার দুটি অংশ সুগঠিত হয়েছিল পাথরের আয়তাকার গঠন দ্বারা। যা ছিল সিন্ধু সভ্যতার পণ্য বিক্রয়ের ঘর।
লোথাল (গুজরাট)
লোথাল শহরটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল--এটি ছিল একটি বন্দর বা পোতাশ্রয়। পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক বন্দর ছিল লোথাল (সিন্ধু সভ্যতার প্রধান সামুদ্রিক বন্দর রূপে পরিচিত)
তাছাড়া সিন্ধু সভ্যতার একমাত্র যে অঞ্চল থেকে ধানের তুষ প্রাপ্ত হয়েছে, তা হল-আমেদাবাদের নিকটবর্তী রংপুর)।
লোথাল এবং কালিবঙ্গান অঞ্চল দুটি থেকেই পুজা বেদি প্রাপ্ত হয়েছে।
লোথাল পরিচিত ছিল সিন্ধু সভ্যতার ম্যাঞ্চেস্টার নগর নামে। কারণ বস্ত্র বাণিজ্য এখানে বিখ্যাত ছিল।
কালিবঙ্গান (রাজস্থান)
সাহিত্যগত দিক থেকে কালিবঙ্গান শব্দটির অর্থ ব্ল্যাক ব্যাঙ্গেল বা কালো কঙ্কণ। এই অঞ্চল থেকে কোনো দেবিকা মূর্তি প্রাপ্ত হয়নি এখান থেকে প্রাচীনতম লাঙ্গল বা কর্ষণকৃত জমি।সাতটি যজ্ঞবেদী এবং পশুচালিত চাকার গাড়ির খেলনা প্রাপ্ত হয়।
চানহুদাড়ো সিন্ধু:-
• চানহুদাড়ো শহরটিতে ভারতের ল্যাঙ্কালিয়ার বলা হয়। এটি একমাত্র শহর যাতে কোনো নগর দুর্গ-র অস্তিত্ব নেই।
এই শহর থেকে একটি ছোটো পাত্র প্রাপ্ত হয়। মনে করা হয় এটি ছিল একটি কালির দোয়াত। তবে এই বিষয়টি চূড়ান্ত রূপে স্বীকৃত নয়।
• এখান থেকে চালক দ্বারা পরিচালিত পশুর গাড়ি এবং ইটের উপর কুকুরের ছাপ মেলে।
সুকটাজেন্দর
পাকিস্তান-ইরান সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশে সুটকাজেন্দর অবস্থিত। এটি সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত। এই নগরটিতে দুর্গের উপস্থিতি ছিল এবং নগরটি 30 ফুট প্রশস্ত পাঁচিল দ্বারা ঘেরা ছিল।
• সুটকাজেন্দর নগরটি গুজরাটের লোথাল থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সুদীর্ঘ বানিজ্যপথে অবস্থিত ছিল।
দাইমাবাদ:-
• 1958 সালে আবিষ্কৃত সিন্ধু সভ্যতার এই নগরটি মহারাষ্ট্রের মুম্বাই-এর কাছে অবস্থিত। এই নগরটির
সিন্ধু সভ্যতায় উপস্থিতি ছিল কিনা তাই নিয়ে নৃতত্ত্ববিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে।
এখান থেকে রথচালক দ্বারা পরিচালিত রথের ব্রোঞ্জের ছবি সহ ষাঁড়, হাতি, গন্ডারের মূর্তি প্রাপ্ত হয়।
কোটডিজি:-
1958 সালে এফ. এ. খান কর্তৃক আবিষ্কৃত কোট ডিজি সিন্ধু নদের পূর্ব তীরে একটি পাথর নির্মিত পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।কোটডিজির নগর পরিকল্পনায় দুর্গ এবং নিচু শহরের পরিচয় পাই। ঐতিহাসিকরা এটিকে প্রাক হরপ্পা যুগীয় অঞ্চল বলে দাবি করেছেন। এখানে বাড়িগুলি পোড়া ইট এবং টেরাকোটা শিল্প রীতির দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে পাথরের ব্যবহৃত জিনিসসহ পাথর নির্মিত তীরের মাথা প্রাপ্ত হয়েছে।
নগর পরিকল্পনা এবং গঠন :-
সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা ছিল অপরিকল্পিত। এই সভ্যতার নগর পরিকল্পনার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল- জলের দ্বারা বাহিত আবর্জনাকে আটকাবার জন্য নর্দমার মধ্যে ঝাঁজরি থাকতো। তাছাড়া নগরের রাস্তাগুলি একে অপরকে সমকোণে সংযুক্ত থাকতো। এমনকি এই সভ্যতার নগরগুলি দুটি আয়তাকার ব্লকে বিভক্ত
• নগরগুলি দুটি খণ্ডে বিভক্ত থাকতো, যথা-উপরের অংশ বা সিটাডেল বা নগর দুর্গ এবং নিম্ন অংশ।
· সিটাডেলগুলি নগরের পশ্চিমাংশে ছিল।সেখানকার অট্টালিকাসমূহে শাসক শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করত।
• অন্যদিকে সিটাডেলের নিম্নাংশে অর্থাৎ নগরের পূর্ব প্রান্তের অট্টালিকা সমূহে সাধারণ শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করত।
• নগরের অট্টালিকাগুলি দোতলা অথবা তারও বেশি তল বিশিষ্ট হত। সাধারণ বাড়িগুলির প্রবেশদ্বার পাশের দিকে থাকতো। এমনকি বাড়িগুলির সামনের দিকে কোনো জানালা থাকত না।
• নগরগুলি অধিকমাত্রায় পোড়া ইটের অট্টালিকা প্রাপ্ত হলেও সম্পূর্ণরূপে পাথর নির্মিত অট্টালিকা অনুপস্থিত ছিল।
• ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থায় নগরের সমস্ত অট্টালিকা সমূহের নালাগুলি বড়ো রাস্তার নর্দমায় পতিত হত। নর্দমাগুলিকে ইট বা পাথরের ঢাকনা দ্বারা চাপা দেওয়া থাকত। তৎসহ সজ্জিত ম্যানহোল ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। নর্দমাগুলিতে চুন দেওয়া হত। তাই বলা যায় সিন্ধু বাসিরা ছিল স্বাস্থ্যসচেতন।
বৃহৎ স্নানাগার (মহেঞ্জোদাড়ো):-এই স্নানাগারটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। স্নানাগারটির উভয় প্রান্ত থেকে সিঁড়ির ধাপ তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৎসহ স্নানাগারটির মধ্যে জল ভরার জন্য নল এবং জল
নিষ্কাশন এর জন্য পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল।
বৃহৎ শস্যাগার (হরপ্পা):-হরপ্পার সিটাডেল বা নগর দুর্গগুলি সংলগ্ন সারিবদ্ধ ছয়টি শস্যাগার ছিল।
সামাজিক জীবন :-
• কার্যের উপর ভিত্তি করে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত ছিল। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ এই হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
• জাতিভেদ প্রথা কিংবা বর্ণ প্রথার প্রচলন ছিল না। পন্ডিতরা অনুমান করেন এই শহরে ক্রীতদাস ছিল। তারা মূলত শহরের জঞ্জাল পরিষ্কার, ভারী বোঝা বহন প্রভৃতি কাজগুলো করে থাকতো
• হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের ফলমূল, তিল, খেজুর, গম, বার্লি, যব, ভাত, শাকসবজি, মুরগি, ভেড়া, গরু, বিভিন্ন পশু-পাখির মাংস, দুধ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতো। এছাড়া মাছ শিকারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• পোশাক হিসেবে পশম এবং সুতিবস্ত্র উভয়ই ব্যবহার করত। দুই খন্ড পোশাক দ্বারা শরীর আচ্ছাদিত থাকতো। উপরের অংশের বস্ত্রকে বলা হতো নিবি এবং নিম্নাঙ্গের কাকে বলা হত পরিধান।
• ছেলে ও মেয়ে উভয়েই অলংকার ব্যবহার করত। মেয়েরা সোনা ও রুপোর ফিতে দিয়ে নানা ধরনের খোপা করতো। এছাড়া নানা ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী, সুগন্ধি এমনকি সুরমার ব্যবহারও তারা জানতো।
• গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে গরু, মোষ, ভেড়া, ছাগল, ছিল উল্লেখযোগ্য।
• তাম্র প্রস্তর যুগের এই মানুষেরা তামা, ব্রোঞ্চ ও পাথরের তৈরি কুঠার, তির-ধনুক, বর্শা প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করত। তবে আত্মরক্ষামূলক কোন অস্ত্র যেমন-ঢাল, শিরস্ত্রানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের অবসরে বিনোদনের মূল উপায় ছিল পাশা খেলা, রথচালনা, ষাঁড়ের লড়াই, শিকার, নৃত্যগীতি প্রভৃতি। জুয়া খেলা ছিল খুব জনপ্রিয়।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের দাহ করা এবং কবর দেওয়া উভয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• কুমোরের চাকার সাহায্যে বিভিন্ন মৃৎপাত্র তৈরি করা হতো এইসময়। এগুলো ছিল মূলত উজ্জ্বল বা কালচে লাল রঙের। খুব ভালোভাবে পুড়িয়ে এর গায়ে বিভিন্ন লিপি প্রদান করা হতো।
ধর্মীয় জীবন :-
মেসোপটেমিয়া মিশরীয় সভ্যতার সাথে সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় জীবনের অনেক মিল পাওয়া যায়।
• হরপ্পা সভ্যতা ছিল মূলত মাতৃতান্ত্রিক সভ্যতা।
• প্রাকৃতিক কোন জিনিসের পুজো করতে দেখা যায়নি।
• সূর্য উপাসনার প্রচলন ছিল বলে ধারণা করা হয়।
• পুরুষ শক্তির প্রতীক ছিল পশুপতি শিব (ত্রিমুখ বিশিষ্ট ধ্যানরত একযোগী মুর্তী)।
• মূর্তিটি পাঁচটি পশু দ্বারা পরিবৃত থাকতো বাঘ, মোষ, হাতি, গন্ডার, হরিণ।
· . নারী শক্তির প্রতীক হলো জঠরের মধ্যে থেকে গাছের উৎপত্তি।
রাজনৈতিক জীবন :-
হরপ্পা সভ্যতার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন মত প্রদান করেছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে এই সভ্যতার মূলে একটি কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল নতুবা এত পরিকল্পিত ও উন্নত নগর সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব হতো না। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন বণিক দ্বারা পরিচালিত একটি প্রজাতান্ত্রিক শাসন এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
কৃষিকার্য :-
• হরপ্পা সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল কৃষিকাজ। মনে করা হয় পৃথিবীর মধ্যে প্রথম তুলা চাষ করেন এই হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরাই।
• এছাড়া ধান, যব, বার্লি, বিভিন্ন ফল, মুগ, গম প্রভৃতি চাষ করত।
• সেচ ব্যবস্থার নিদর্শন ও লাঙলের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ব্যবসা বাণিজ্য :-
• ব্যবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধি হরপ্পা সভ্যতা বিকাশের অন্যতম কারণ।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা যে ব্যবসা বাণিজ্য করতো তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মূলত মেসোপটেমিয়া, আফগানিস্তান, সুমের প্রভৃতি দেশের সাথে স্থল ও জলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে। মিশরের সঙ্গে এখানকার অধিবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• মূল রপ্তানি দ্রব্য ছিল তুলা ও সুতির বস্ত্র, হাতির দাঁতের জিনিসপত্র এবং আমদানি করা হতো বিভিন্ন ধাতু যেমন সোনা, রূপা, তামা, জেড পাথর শঙ্খ প্রভৃতি
• বিনিময় প্রথার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো।
নগর পরিকল্পনা:-
• হরপ্পা সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা এবং এই সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তার নগর পরিকল্পনা। সমকালীন পরিস্থিতিতে এত উন্নত নগর পরিকল্পনা পৃথিবীর আর কোন দেশে দেখা যায়নি।
• নগর মূলত দু'ভাগে বিভক্ত ছিল উচ্চ অংশ এবং নিম্ন অংশ। উঁচু স্থানে তৈরি হতো দুর্গ ও উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের বাসস্থান এবং নিম্ন অংশে থাকতো সাধারণ মানুষ।
• পোড়া ইটের ব্যবহার লক্ষণীয়।
• পাকা নর্দমার নিদর্শন দেখতে পাওয়া গেছে। এবং নর্দমা গুলি ঢাকা থাকতো।
• নগরের মূল রাস্তা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত থাকতো।
· . প্রতিটি বাড়িতে ডিম্বাকার কূপের ব্যবস্থা ছিল।
Note:
• মহেঞ্জোদারোতে বৃহৎ স্নানাগারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। মূলত ধর্মীয় কারণে সর্বসাধারণের জন্য নির্মিত হয়েছিল এই স্নানাগার। এর বাইরের আয়তন ছিল 180×108 বর্গফুট এবং ভেতরের আয়তন ছিল 39×23×৪ ঘনফুট।
• রাজস্থানের গঙ্গা নগরে ঘর্ঘরা নদীর তীরে মহেঞ্জোদারোর পশ্চিম দিকে কালিবঙ্গান নামক স্থানে 40 ফুট উঁচু ঢিবির ওপর 169×135 বর্গফুট মাপের একটি বৃহৎ শস্যাগার এর সন্ধান পাওয়া গেছে।
• এছাড়া হরপ্পাতে ছয়টি সারিবদ্ধ শস্যাগার দেখা গেছে। দুর্গের বাইরেও শস্যাগার তৈরি করা হতো।
প্রযুক্তি ও দক্ষতা:-
• হরপ্পাবাসিরা পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করত। তারা এই সময়ে ব্রোঞ্জের সহিত পরিচিত হয়। যা অধিকাংশই তৈরি হতো তামা এবং টিনের সংমিশ্রণে।
• সিন্ধু সভ্যতায় নৌকা তৈরি, ব্রোঞ্জের অলংকার এবং মৃৎপাত্রে চিত্রাংকন (লাল এবং কালো) করা হত।
কুমোরের চাকা সম্পূর্ণ মাত্রায় এই সভ্যতায় ব্যবহৃত হত।
হরপ্পার সিলমোহর:-
• সিন্ধুর সীলমোহরগুলি সাধারণত স্লেট পাথর (নরম পাথর) দ্বারা নির্মিত হতো।
• সিন্ধু সভ্যতার সীলমোহরগুলি কাটার পদ্ধতি এবং মসৃণতার জন্য তা সাদা উজ্জ্বল হয়ে উঠত। যা ছিল সিন্ধু সভ্যতার এক অভূতপূর্ব আবিষ্কার।।
• এই সভ্যতার অধিকাংশ সিলমোহরে পশুর ছবি খোদাই করা হত। তাতে অল্প কিছু লিপি খোদিত হত।
• সিন্ধু সভ্যতার একাধিক সিলমোহরে একশৃঙ্গ বিশিষ্ট ঘোড়ার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাছাড়া মহেঞ্জোদারো থেকে বিখ্যাত ষাঁড়ের চিত্রযুক্ত সীলমোহর প্রাপ্ত হয়।
প্রধান ধরন:-১) বর্গাকৃতির সীলমোহর গুলিতে এক খন্ড পশুর ছবির পাশাপাশি কিছু লিপি লেখা থাকত। ২) আয়তাকৃতির সীলমোহর গুলিতে শুধুমাত্র লিপি খোদিত থাকত।
সিন্ধু সভ্যতাতে বর্তমানে 100 টিরও বেশী শহর আবিষ্কৃত হয়েছে। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলঃ হরপ্পা,
মহেঞ্জোদারো, কালিবঙ্গান, লোখাল, চানহুদারো, কোটদিজি, রংপুর, রাখিগারী প্রভৃতি।
• মহেঞ্জোদারো কথার অর্থ মৃতের স্তুপ।
লোথাল কথার অর্থ মৃতের স্থান।
• হরপ্পা কথার অর্থ পশুপতির খাদ্য।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা ঘোড়ার ব্যবহার জানত না। তবুও ব্যতিক্রমীকভাবে ধোলাভিড়ায় ঘোড়ার নিদর্শন পাওয়া গেছে।
• লোথাল এ পৃথিবীর প্রাচীনতম জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র ও প্রাচীনতম সমুদ্র বন্দরের নিদর্শন পাওয়া গেছে।
• হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা মূলত বলদে টানা গাড়িতে যাতায়াত করতো। এছাড়া কিছু জায়গায় নৌকার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
সিন্ধু সভ্যতার নামকরণ হরপ্পা সভ্যতা হল কেন?
সুপ্রাচীন সভ্যতার সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত স্থলটি সিন্ধু নদের তীরবর্তী অঞ্চলে হওয়ায় এটি সুদীর্ঘকাল যাবত সিন্ধু সভ্যতা নামেই সমধিক পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সিন্ধুতট অতিক্রম করে ভারত ও ভারতের বাইরে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় 1500 টি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া মহেঞ্জোদারোর তুলনায় হরপ্পায় প্রাপ্ত নিদর্শনগুলির অনেক বেশি প্রাচীন ও মহেঞ্জোদারো অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ববিদগণের নিকট এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে সুপরিচিত।
হরপ্পা সভ্যতা পতনের কারণ:-
হরপ্পাবাসীর রক্ষণশীল মানসিকতার এই সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। নতুন কিছু শিখতে চাওয়ার অনীহা এই সভ্যতাকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।
বন্যা ও খরা প্রকোপে নগর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
• নগর কেন্দ্রিকতা ভেঙে পড়ে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণের ফলে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
হরপ্পা সভ্যতার প্রভাব :- ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর হরপ্পা সভ্যতায় প্রভাব ছিল ব্যাপক। হরপ্পা সভ্যতাই
প্রাচীনতম সভ্যতা। মনে করা হয় হিন্দু ধর্মে মূর্তি পূজা, প্রতীক উপাসনা, শিবলিঙ্গ পূজা, বলিদান প্রথা সবই হরপ্পা সভ্যতার অবদান।
Note: সিন্ধুরা লোহার ব্যবহার জানত না এবং আত্মরক্ষামূলক অস্ত্রের ব্যবহার জানত না। অন্যদিকে আর্যরা লোহার অস্ত্র, ঘোড়া, ঢাল, বর্ম নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল যার ফলে আর্যদের জয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন উঠতে পারে আক্রমণকারীরা কি আর্যই ছিল?
> আর্যদের মতে ইন্দ্রের অপর নাম 'পুরন্দর' যার অর্থ নগর ধ্বংসকারী। আর সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি নগর সভ্যতা।
ONELINER NOTE |
সিন্ধুসভ্যতায় প্রথম ধানের চাষ লোথালে হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
লোথাল ছিল বন্দরনগরী, এখানে পোতাশ্রয়ের অস্তিত্ব ছিল
ছাড়াও হরপ্পা, কালিবঙ্গান, রংপুরে ধানের চাষ হত বলে মনে করা হয়।
চানহুদারো ছিল একমাত্র স্থান যেটি ছিল কোনোপ্রকার দুর্গবিহীন। অর্থাৎ এখানে কোনো দুর্গ ছিল না।
জলনিকাশি ব্যবস্থা সর্বাপেক্ষা সুন্দর ছিল চানহুদারোতে।
কালিবঙ্গানে জলনিকাশি ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল।
হরপ্পা সভ্যতায় রাখিগড়াই অঞ্চলে মেয়েদের জন্য পৃথক সমাধিক্ষেত্রের কথা জানা যায়।
কালিবঙ্গানে আবিষ্কৃত একটি বিশিষ্ট নিদর্শন হল একটি চষাক্ষেত্রের অস্তিত্ব, হরপ্পা সভ্যতায় হরপ্পাকে ‘প্রবেশদ্বার' আখ্যা দেওয়া হয়। এখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিলমোহর মিলেছে।
ভারতের সীমান্তভুক্ত বৃহত্তম হরপ্পা সভ্যতার কেন্দ্রস্থল দুটি হল – ঢোলাভিরা (গুজরাট) এবং রাখিগড়ি (হরিয়ানা)
হরপ্পার সিলে প্রদত্ত পুরুষ দেবতাকে স্যার জন মার্শাল পশুপতি শিব এবং ব্যাসাম 'আদি শিব' বলে মনে করেন।
কালিবঙ্গানে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ছিল কাঁচা ইটের তৈরি।
মৃতদেহকে সাধারণত কবরস্থানের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে শায়িত করার নিয়ম ছিল। শবের মাথা উত্তর দিকে রাখা হত।
মহেঞ্জোদাড়ো শহরের পশ্চিম এলাকায় আর্নেস্ট ম্যাকে একটি বৃহৎ আকৃতির বাড়িকে 'কলেজ বাড়ি' আখ্যা দেন এবং স্যার জন মার্শা এখানেই আরেকটি বাড়িকে “সভাগৃহ” বলে বর্ণনা করেছেন। এটিই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম হলঘরের ধ্বংসাবশেষ।
হরপ্পাবাসী ভক্তিবাদ, জন্মান্তরবাদে এবং পরলোকে বিশ্বাসী
হরপ্পাবাসীদের ধর্মবিশ্বাসে মন্দির বা দেবালয়ের কোনো স্থান ছিল না বলেই মনে করা হয়।
হরপ্পায় প্রাপ্ত এক সিলমোহরে পা তোলা ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান নারীর উদর থেকে এক চারগাছ বের হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। কিছু ঐতিহাসিকদে অনুমান এটি ভূমাতার মূর্তি,
হরপ্পায় বাড়িগুলি পোড়া ইটের তৈরি হত।
লোথাল শব্দের অর্থ মৃতের স্থান। হরপ্পা সভ্যতায় লোথাল ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম বন্দর বা পোতাশ্রয়।
রাস্তা তৈরিতে চুন, সুড়কি জাতীয় জিনিস ও পাথর ব্যবহৃত হত।
হরপ্পাবাসীরা তামা, ব্রোঞ্জ ও পাথরের তৈরি কুঠার, বর্শা, তির, ধনুক, মুষল, কাস্তে প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করত। সিন্ধু সভ্যতায় ঢাল, বা শিরস্ত্রাণ প্রভৃতি আত্মরক্ষামূলক অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি।
বস্ত্রবয়ন শিল্প ছিল হরপ্পার প্রধান শিল্প।