সিপাহী বিদ্রোহ (The Revolt of 1857)
১. বিস্তারিত বাংলা নোট (Comprehensive Notes)
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ (বা মহাবিদ্রোহ) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এটি ছিল ভারতীয়দের প্রথম সংগঠিত ও ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান।
বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ
রাজনৈতিক কারণ: লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) এবং লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) ভারতীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে ১৮৫৬ সালে অপশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা (Awadh) অধিকার করা এবং পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানাসাহেব-এর ভাতা বন্ধ করে দেওয়া বিদ্রোহের আগুনকে উস্কে দেয়।
অর্থনৈতিক কারণ: ব্রিটিশদের কঠোর ভূমিরাজস্ব নীতি (যেমন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, রায়তওয়ারী), অতিরিক্ত করের বোঝা এবং দেশীয় কুটির শিল্পের ধ্বংস ভারতের কৃষক ও কারিগর শ্রেণীকে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেয়।
সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ: সতীদাহ প্রথা বিলোপ (১৮২৯), বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬) এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন করানোর প্রচেষ্টা রক্ষণশীল ভারতীয়দের মনে ভীতি তৈরি করে যে ব্রিটিশরা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চাইছে।
সামরিক কারণ: ভারতীয় সিপাহীদের সাথে শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের বেতনের বৈষম্য, পদোন্নতির অভাব এবং ১৮৫৬ সালের সাধারণ চাকুরিজীবী সেনাভর্তি আইন (General Service Enlistment Act)—যার মাধ্যমে সিপাহীদের সমুদ্রযাত্রা বাধ্যতামূলক করা হয় (যা তৎকালীন হিন্দু ধর্মে পাপ মনে করা হতো)।
প্রত্যক্ষ কারণ (Immediate Cause): সেনাবাহিনীতে পুরানো 'ব্রাউন ব্যাস' বন্দুকের পরিবর্তে এনফিল্ড রাইফেল (Enfield Rifle)-এর প্রবর্তন। এই রাইফেলের টোটা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো, যাতে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো থাকার গুজব ছড়ায়। এটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৈনিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে।
বিদ্রোহের সূচনা ও বিস্তার
প্রথম স্ফুলিঙ্গ (ব্যারাকপুর): ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ তারিখে বাংলার ব্যারাকপুর সেনানিবাসে ৩৪ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডে (Mangal Pandey) প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং লেফট্যানেন্ট বাঘ (Baugh)-কে গুলি করেন। ৮ এপ্রিল, ১৮৫৭ তারিখে মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি হয়।
আনুষ্ঠানিক সূচনা (মিরাট): ১০ মে, ১৮৫৭ তারিখে মিরাট সেনানিবাসে সিপাহীরা সংগঠিতভাবে বিদ্রোহ শুরু করেন, অফিসারদের হত্যা করেন এবং দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
দিল্লি অধিকার: ১১ মে সিপাহীরা দিল্লি পৌঁছান এবং ১২ মে দিল্লির লাল কেল্লা অধিকার করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (Bahadur Shah II)-কে ভারতের সম্রাট বা 'শাহেনশাহ-ই-হিন্দুস্তান' বলে ঘোষণা করেন।
বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র এবং নেতৃত্ব (Leaders & Centres)
বিদ্রোহের কেন্দ্র | ভারতীয় নেতৃত্ব | দমনকারী ব্রিটিশ অফিসার |
দিল্লি | দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ও জেনারেল বখত খান | জন নিকোলসন (John Nicholson), হাডসন |
কানপুর | নানা সাহেব ও তাঁতিয়া তোপী (রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ) | স্যার কলিন ক্যাম্পবেল (Colin Campbell) |
লক্ষ্ণৌ (অযোধ্যা) | বেগম হযরত মহল ও বিরজিস কাদির | স্যার কলিন ক্যাম্পবেল |
ঝাঁসি | রানী লক্ষ্মীবাঈ (মণিকর্ণিকা) | স্যার হিউ রোজ (Hugh Rose) |
বেরিলী | খান বাহাদুর খান | কলিন ক্যাম্পবেল |
বিহার (জগদীশপুর) | কুঁয়ার সিংহ (Kunwar Singh) ও অমর সিংহ | উইলিয়াম টেলর ও ভিনসেন্ট আয়ার |
ফৈজাবাদ | মৌলভী আহমদুল্লাহ | জেনারেল রেনল্ড |
Exam Focus Point (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য)
বিদ্রোহের সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী: লর্ড পামারস্টন (Lord Palmerston)।
বিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল: লর্ড ক্যানিং (Lord Canning)।
রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের আসল নাম: মণিকর্ণিকা (ডাকনাম: মনু)। ঝাঁসিতে তাঁর বীরত্ব দেখে ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোজ তাঁকে "বিদ্রোহীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ" বলে অভিহিত করেছিলেন।
তাঁতিয়া তোপীর আসল নাম: রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপী। ১৮৫৯ সালে তাঁর এক বন্ধু মানসিংহের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তিনি ধরা পড়েন এবং তাঁর ফাঁসি হয়।
মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি: ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল ব্যারাকপুরে। তিনি ছিলেন মহাবিদ্রোহের প্রথম শহীদ।
১৮৫৭-র বিদ্রোহকে বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের আখ্যা:
স্যার জন সিলি ও জন লরেন্স: "বিশুদ্ধ সিপাহী বিদ্রোহ" (Mere Sepoy Mutiny)।
বিনায়ক দামোদর সাভারকর (V. D. Savarkar): তাঁর 'The Indian War of Independence 1857' বইতে একে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ" (First War of Indian Independence) বলে বর্ণনা করেছেন।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার (R. C. Majumdar): তাঁর মতে, "এটি প্রথম নয়, জাতীয় নয় এবং স্বাধীনতার যুদ্ধও নয়" (Neither First, Nor National, Nor a War of Independence)।
ডিসরেইলি (Disraeli): ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একে "জাতীয় উত্থান" (National Revolt) বলে উল্লেখ করেছিলেন।
বিদ্রোহের অবসান ও ফলাফল
Ø ১৮৫৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে (মায়ানমার) নির্বাসিত করা হয়, যেখানে ১৮৬২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
Ø ভারত শাসন আইন, ১৮৫৮ (Government of India Act, 1858): এই আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউন বা রাজপরিবারের হাতে চলে যায়।
Ø মহারানীর ঘোষণা (১ নভেম্বর, ১৮৫৮): এলাহাবাদের দরবারে লর্ড ক্যানিং মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণাটি পাঠ করেন। এর মাধ্যমে গভর্নর জেনারেল পদটি বিলুপ্ত করে 'ভাইসরয়' (Viceroy) পদের সৃষ্টি করা হয় এবং লর্ড ক্যানিং হন ভারতের প্রথম ভাইসরয়। স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয়।
Ø পিল কমিশন (Peel Commission): বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনের জন্য এই কমিশন গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ও ভারতীয় সৈনিকদের অনুপাত ২:১ (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে) করা হয় এবং গোলন্দাজ বাহিনী সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
সংক্ষিপ্ত Revision Notes
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেল ও চর্বিযুক্ত কার্তুজ।
প্রথম শহীদ মঙ্গল পাণ্ডে (২৯ মার্চ ১৮৫৭, ব্যারাকপুর)।
বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনা ১০ মে ১৮৫৭, মিরাট থেকে।
দিল্লির প্রতীকী নেতা ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ, সামরিক নেতা ছিলেন বখত খান।
কানপুরের নেতৃত্ব দেন দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানা সাহেব (আসল নাম ধন্দুপন্থ)।
ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন ব্রিটিশ অফিসার স্যার হিউ রোজ।
বিহারে ৮০ বছর বয়সী রাজপুত জমিদার কুঁয়ার সিংহ অসামান্য বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দেন।
১৮৫৭-র বিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ক্যানিং।
এই বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালের আইন অনুযায়ী কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে।
ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন লর্ড ক্যানিং।
দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে নির্বাসিত করা হয় রেঙ্গুনে।
ভি. ডি. সাভারকর একে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ" বলেছিলেন।
বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এবং সিন্ধিয়া, হোলকার ও নিজামের মতো দেশীয় রাজন্যবর্গ এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেননি (তাঁরা ব্রিটিশদের অনুগত ছিলেন)।
১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর মহারানীর ঘোষণা এলাহাবাদে পাঠ করেন লর্ড ক্যানিং।
সামরিক সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশনের নাম পিল কমিশন (Peel Commission)।
নতুন প্রশাসনিক পদ: বোর্ড অফ কন্ট্রোল ও কোর্ট অফ ডিরেক্টর্স বিলুপ্ত করে সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া (ভারত সচিব) পদ তৈরি হয়।
২. Competitive Exam Special Section
Previous Year Questions-এর ধাঁচে গুরুত্বপূর্ণ Facts:
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সরকারি ঐতিহাসিক কে ছিলেন? ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন (S. N. Sen)। তাঁর রচিত বিখ্যাত সরকারি বইটির নাম 'Eighteen Fifty-Seven (1857)'। ড. আর. সি. মজুমদার প্রথমে এই দায়িত্ব পেলেও সরকারি মতভেদের কারণে পদত্যাগ করেছিলেন।
আজিমুল্লাহ খান কে ছিলেন? তিনি ছিলেন কানপুরের নানা সাহেবের বিশ্বস্ত উপদেষ্টা এবং দূত, যিনি লণ্ডনে নানা সাহেবের ভাতার দাবি জানাতে গিয়েছিলেন। তিনি বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন।
বিদ্রোহের প্রতীক কী ছিল? ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের গোপন প্রচারের প্রতীক ছিল "পদ্মফুল এবং রুটি" (Lotus and Chapatis)।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে বাংলার কোন অঞ্চল অস্পৃশ্য ছিল? সামগ্রিকভাবে বাংলা প্রেসিডেন্সির সাধারণ মানুষ এবং কলকাতা ও আশপাশের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এই বিদ্রোহ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিলেন।
বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় ও ইউরোপীয় সৈনিকদের অনুপাত ঠিক করার জন্য কোন কমিশন গঠিত হয়? উত্তর: পিল কমিশন (Peel Commission, 1858)।
Confusing Facts (বিভ্রান্তিকর তথ্যের তুলনা):
বিদ্রোহের সূচনা বনাম আনুষ্ঠানিক সূচনা: ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ (এটি ছিল বিক্ষিপ্ত ঘটনা)। কিন্তু সমগ্র ভারতে সংগঠিতভাবে বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ১০ মে, ১৮৫৭ মিরাটে।
নানা সাহেব বনাম তাঁতিয়া তোপী: নানা সাহেব ছিলেন পেশোয়া এবং রাজনৈতিক নেতা (আসল নাম: ধন্দুপন্থ)। তাঁতিয়া তোপী ছিলেন তাঁর সেনাপতি বা সামরিক কমান্ডার (আসল নাম: রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপী)।
গভর্নর জেনারেল বনাম ভাইসরয়: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় লর্ড ক্যানিং ছিলেন গভর্নর জেনারেল। কিন্তু বিদ্রোহের পর ১ নভেম্বর, ১৮৫৮ থেকে তিনি হন ভারতের প্রথম ভাইসরয়। ব্যক্তি একই, কিন্তু পদের নাম ও মর্যাদা পরিবর্তিত হয়েছিল।
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
সিপাহী বিদ্রোহ (The Revolt of 1857)
১. বিস্তারিত বাংলা নোট (Comprehensive Notes)
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ (বা মহাবিদ্রোহ) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এটি ছিল ভারতীয়দের প্রথম সংগঠিত ও ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান।
বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ
রাজনৈতিক কারণ: লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) এবং লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) ভারতীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে ১৮৫৬ সালে অপশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা (Awadh) অধিকার করা এবং পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানাসাহেব-এর ভাতা বন্ধ করে দেওয়া বিদ্রোহের আগুনকে উস্কে দেয়।
অর্থনৈতিক কারণ: ব্রিটিশদের কঠোর ভূমিরাজস্ব নীতি (যেমন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, রায়তওয়ারী), অতিরিক্ত করের বোঝা এবং দেশীয় কুটির শিল্পের ধ্বংস ভারতের কৃষক ও কারিগর শ্রেণীকে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেয়।
সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ: সতীদাহ প্রথা বিলোপ (১৮২৯), বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬) এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন করানোর প্রচেষ্টা রক্ষণশীল ভারতীয়দের মনে ভীতি তৈরি করে যে ব্রিটিশরা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চাইছে।
সামরিক কারণ: ভারতীয় সিপাহীদের সাথে শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের বেতনের বৈষম্য, পদোন্নতির অভাব এবং ১৮৫৬ সালের সাধারণ চাকুরিজীবী সেনাভর্তি আইন (General Service Enlistment Act)—যার মাধ্যমে সিপাহীদের সমুদ্রযাত্রা বাধ্যতামূলক করা হয় (যা তৎকালীন হিন্দু ধর্মে পাপ মনে করা হতো)।
প্রত্যক্ষ কারণ (Immediate Cause): সেনাবাহিনীতে পুরানো 'ব্রাউন ব্যাস' বন্দুকের পরিবর্তে এনফিল্ড রাইফেল (Enfield Rifle)-এর প্রবর্তন। এই রাইফেলের টোটা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো, যাতে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো থাকার গুজব ছড়ায়। এটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৈনিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে।
বিদ্রোহের সূচনা ও বিস্তার
প্রথম স্ফুলিঙ্গ (ব্যারাকপুর): ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ তারিখে বাংলার ব্যারাকপুর সেনানিবাসে ৩৪ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডে (Mangal Pandey) প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং লেফট্যানেন্ট বাঘ (Baugh)-কে গুলি করেন। ৮ এপ্রিল, ১৮৫৭ তারিখে মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি হয়।
আনুষ্ঠানিক সূচনা (মিরাট): ১০ মে, ১৮৫৭ তারিখে মিরাট সেনানিবাসে সিপাহীরা সংগঠিতভাবে বিদ্রোহ শুরু করেন, অফিসারদের হত্যা করেন এবং দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
দিল্লি অধিকার: ১১ মে সিপাহীরা দিল্লি পৌঁছান এবং ১২ মে দিল্লির লাল কেল্লা অধিকার করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (Bahadur Shah II)-কে ভারতের সম্রাট বা 'শাহেনশাহ-ই-হিন্দুস্তান' বলে ঘোষণা করেন।
বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র এবং নেতৃত্ব (Leaders & Centres)
বিদ্রোহের কেন্দ্র | ভারতীয় নেতৃত্ব | দমনকারী ব্রিটিশ অফিসার |
দিল্লি | দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ও জেনারেল বখত খান | জন নিকোলসন (John Nicholson), হাডসন |
কানপুর | নানা সাহেব ও তাঁতিয়া তোপী (রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ) | স্যার কলিন ক্যাম্পবেল (Colin Campbell) |
লক্ষ্ণৌ (অযোধ্যা) | বেগম হযরত মহল ও বিরজিস কাদির | স্যার কলিন ক্যাম্পবেল |
ঝাঁসি | রানী লক্ষ্মীবাঈ (মণিকর্ণিকা) | স্যার হিউ রোজ (Hugh Rose) |
বেরিলী | খান বাহাদুর খান | কলিন ক্যাম্পবেল |
বিহার (জগদীশপুর) | কুঁয়ার সিংহ (Kunwar Singh) ও অমর সিংহ | উইলিয়াম টেলর ও ভিনসেন্ট আয়ার |
ফৈজাবাদ | মৌলভী আহমদুল্লাহ | জেনারেল রেনল্ড |
Exam Focus Point (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য)
বিদ্রোহের সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী: লর্ড পামারস্টন (Lord Palmerston)।
বিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল: লর্ড ক্যানিং (Lord Canning)।
রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের আসল নাম: মণিকর্ণিকা (ডাকনাম: মনু)। ঝাঁসিতে তাঁর বীরত্ব দেখে ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোজ তাঁকে "বিদ্রোহীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ" বলে অভিহিত করেছিলেন।
তাঁতিয়া তোপীর আসল নাম: রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপী। ১৮৫৯ সালে তাঁর এক বন্ধু মানসিংহের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তিনি ধরা পড়েন এবং তাঁর ফাঁসি হয়।
মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি: ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল ব্যারাকপুরে। তিনি ছিলেন মহাবিদ্রোহের প্রথম শহীদ।
১৮৫৭-র বিদ্রোহকে বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের আখ্যা:
স্যার জন সিলি ও জন লরেন্স: "বিশুদ্ধ সিপাহী বিদ্রোহ" (Mere Sepoy Mutiny)।
বিনায়ক দামোদর সাভারকর (V. D. Savarkar): তাঁর 'The Indian War of Independence 1857' বইতে একে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ" (First War of Indian Independence) বলে বর্ণনা করেছেন।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার (R. C. Majumdar): তাঁর মতে, "এটি প্রথম নয়, জাতীয় নয় এবং স্বাধীনতার যুদ্ধও নয়" (Neither First, Nor National, Nor a War of Independence)।
ডিসরেইলি (Disraeli): ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একে "জাতীয় উত্থান" (National Revolt) বলে উল্লেখ করেছিলেন।
বিদ্রোহের অবসান ও ফলাফল
Ø ১৮৫৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে (মায়ানমার) নির্বাসিত করা হয়, যেখানে ১৮৬২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
Ø ভারত শাসন আইন, ১৮৫৮ (Government of India Act, 1858): এই আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউন বা রাজপরিবারের হাতে চলে যায়।
Ø মহারানীর ঘোষণা (১ নভেম্বর, ১৮৫৮): এলাহাবাদের দরবারে লর্ড ক্যানিং মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণাটি পাঠ করেন। এর মাধ্যমে গভর্নর জেনারেল পদটি বিলুপ্ত করে 'ভাইসরয়' (Viceroy) পদের সৃষ্টি করা হয় এবং লর্ড ক্যানিং হন ভারতের প্রথম ভাইসরয়। স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয়।
Ø পিল কমিশন (Peel Commission): বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনের জন্য এই কমিশন গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ও ভারতীয় সৈনিকদের অনুপাত ২:১ (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে) করা হয় এবং গোলন্দাজ বাহিনী সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
সংক্ষিপ্ত Revision Notes
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেল ও চর্বিযুক্ত কার্তুজ।
প্রথম শহীদ মঙ্গল পাণ্ডে (২৯ মার্চ ১৮৫৭, ব্যারাকপুর)।
বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনা ১০ মে ১৮৫৭, মিরাট থেকে।
দিল্লির প্রতীকী নেতা ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ, সামরিক নেতা ছিলেন বখত খান।
কানপুরের নেতৃত্ব দেন দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানা সাহেব (আসল নাম ধন্দুপন্থ)।
ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন ব্রিটিশ অফিসার স্যার হিউ রোজ।
বিহারে ৮০ বছর বয়সী রাজপুত জমিদার কুঁয়ার সিংহ অসামান্য বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দেন।
১৮৫৭-র বিদ্রোহের সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ক্যানিং।
এই বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালের আইন অনুযায়ী কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে।
ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন লর্ড ক্যানিং।
দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে নির্বাসিত করা হয় রেঙ্গুনে।
ভি. ডি. সাভারকর একে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ" বলেছিলেন।
বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এবং সিন্ধিয়া, হোলকার ও নিজামের মতো দেশীয় রাজন্যবর্গ এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেননি (তাঁরা ব্রিটিশদের অনুগত ছিলেন)।
১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর মহারানীর ঘোষণা এলাহাবাদে পাঠ করেন লর্ড ক্যানিং।
সামরিক সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশনের নাম পিল কমিশন (Peel Commission)।
নতুন প্রশাসনিক পদ: বোর্ড অফ কন্ট্রোল ও কোর্ট অফ ডিরেক্টর্স বিলুপ্ত করে সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া (ভারত সচিব) পদ তৈরি হয়।
২. Competitive Exam Special Section
Previous Year Questions-এর ধাঁচে গুরুত্বপূর্ণ Facts:
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সরকারি ঐতিহাসিক কে ছিলেন? ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন (S. N. Sen)। তাঁর রচিত বিখ্যাত সরকারি বইটির নাম 'Eighteen Fifty-Seven (1857)'। ড. আর. সি. মজুমদার প্রথমে এই দায়িত্ব পেলেও সরকারি মতভেদের কারণে পদত্যাগ করেছিলেন।
আজিমুল্লাহ খান কে ছিলেন? তিনি ছিলেন কানপুরের নানা সাহেবের বিশ্বস্ত উপদেষ্টা এবং দূত, যিনি লণ্ডনে নানা সাহেবের ভাতার দাবি জানাতে গিয়েছিলেন। তিনি বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন।
বিদ্রোহের প্রতীক কী ছিল? ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের গোপন প্রচারের প্রতীক ছিল "পদ্মফুল এবং রুটি" (Lotus and Chapatis)।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে বাংলার কোন অঞ্চল অস্পৃশ্য ছিল? সামগ্রিকভাবে বাংলা প্রেসিডেন্সির সাধারণ মানুষ এবং কলকাতা ও আশপাশের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এই বিদ্রোহ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিলেন।
বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় ও ইউরোপীয় সৈনিকদের অনুপাত ঠিক করার জন্য কোন কমিশন গঠিত হয়? উত্তর: পিল কমিশন (Peel Commission, 1858)।
Confusing Facts (বিভ্রান্তিকর তথ্যের তুলনা):
বিদ্রোহের সূচনা বনাম আনুষ্ঠানিক সূচনা: ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ (এটি ছিল বিক্ষিপ্ত ঘটনা)। কিন্তু সমগ্র ভারতে সংগঠিতভাবে বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ১০ মে, ১৮৫৭ মিরাটে।
নানা সাহেব বনাম তাঁতিয়া তোপী: নানা সাহেব ছিলেন পেশোয়া এবং রাজনৈতিক নেতা (আসল নাম: ধন্দুপন্থ)। তাঁতিয়া তোপী ছিলেন তাঁর সেনাপতি বা সামরিক কমান্ডার (আসল নাম: রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ তোপী)।
গভর্নর জেনারেল বনাম ভাইসরয়: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় লর্ড ক্যানিং ছিলেন গভর্নর জেনারেল। কিন্তু বিদ্রোহের পর ১ নভেম্বর, ১৮৫৮ থেকে তিনি হন ভারতের প্রথম ভাইসরয়। ব্যক্তি একই, কিন্তু পদের নাম ও মর্যাদা পরিবর্তিত হয়েছিল।