রাউলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং অসহযোগ আন্দোলন (১৯১৯ - ১৯২২)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) পর ভারতীয়রা আশা করেছিল ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বায়ত্তশাসন বা রাজনৈতিক অধিকার দেবে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের দাবি পূরণের বদলে ১৯১৯ সালে দমনমূলক রাউলাট আইন পাস করে। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যার নৃশংসতম পরিণতি ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড।
এই চরম অন্যায় ও আস্থার সংকটের প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় গণআন্দোলন — অসহযোগ আন্দোলন (Non-Cooperation Movement) গড়ে তোলেন।
বিস্তারিত আলোচনা (Detailed Analysis)
রাউলাট আইন (Rowlatt Act - 1919)
(A) পটভূমি ও পাস
অফিসিয়াল নাম: Anarchical and Revolutionary Crimes Act of 1919।
কমিটি: স্যার সিডনি রাউলাট (Sir Sidney Rowlatt)-এর নেতৃত্বাধীন 'রাউলাট কমিটি' (Sedition Committee)-র সুপারিশে ১৯১৯ সালের ১৮ই মার্চ আইনটি পাস হয়।
(B) মূল বৈশিষ্ট্য ও কালো আইন
এই আইনের অধীনে পুলিশ কোনো পরোয়ানা ছাড়াই যে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করতে পারত এবং বিনা বিচারে ২ বছর পর্যন্ত আটক রাখতে পারত।
কোনো আইনজীবী নিয়োগ, আপিল বা যুক্তির সুযোগ ছিল না। তাই একে বলা হতো: "নো দলিল, নো উকিল, নো আপিল" (No Dalil, No Vakil, No Appeal)।
ভারতীয়রা এই আইনকে "কালো আইন" (Black Act) আখ্যা দেয়।
(C) প্রতিক্রিয়া
গান্ধীজি এই আইনের বিরুদ্ধে 'রাউলাট সত্যগ্রহ' (Rowlatt Satyagraha) আহ্বান জানান এবং ১৯১৯ সালের ৬ই এপ্রিল দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেন।
এটিই ছিল গান্ধীজির নেতৃত্বে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় ধর্মঘট/আন্দোলন।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (Jallianwala Bagh Massacre - 13th April 1919)
(A) পটভূমি
পাঞ্জাবের দুই প্রখ্যাত জনপ্রিয় নেতা ⭐ ড. সত্যপাল (Dr. Satyapal) এবং ড. সাইফুদ্দিন কিচলু (Dr. Saifuddin Kitchlew)-কে রাউলাট আইনের অধীনে গ্রেফতার করা হয়।
এর প্রতিবাদে এবং বৈশাখী উৎসব (Baisakhi Festival) উদযাপন করতে ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ মাঠে এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আয়োজিত হয়।
(B) নারকীয় হত্যাকাণ্ড
অমৃতসরের সামরিক প্রধান ⭐ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার (General Reginald Dyer) ওই মাঠে ঢোকার একমাত্র সংকীর্ণ পথটি অবরুদ্ধ করে দেন।
কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই নিরস্ত্র ও জনসমাবেশের ওপর টানা ১০ মিনিট ধরে ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। সরকারি হিসেবে ৩৭৯ জন এবং বেসরকারি হিসেবে ১,০০০-এর বেশি মানুষ শহীদ হন।
(দ্রষ্টব্য: তৎকালীন পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন মাইকেল ও'ডায়ার (Michael O'Dwyer), যাঁকে পরবর্তীকালে ১৯৪০ সালে লন্ডনে বিপ্লবী উধম সিং (Udham Singh) হত্যা করেন।)
(C) জাতীয় প্রতিক্রিয়া ⭐
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ব্রিটিশদের দেওয়া 'নাইটহুড' (Knighthood / Sir) উপাধি ত্যাগ করেন (মে ১৯১৯)।
মহাত্মা গান্ধী: তাঁর 'কায়সার-ই-হিন্দ' (Kaisar-i-Hind) স্বর্ণপদক ফিরিয়ে দেন।
শঙ্করন নায়ার (Shankaran Nair): ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন।
হান্টার কমিশন (Hunter Commission): হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের অক্টোবরে লর্ড হান্টারের নেতৃত্বে 'ডায়রিমারি কমিশন' বা হান্টার কমিশন গঠন করে (ভারতীয় সদস্য ছিলেন চিমনলাল সতালবাদ, পণ্ডিত জগৎ নারায়ণ, সুলতান আহমেদ)।
খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন (১৯১৯ - ১৯২২)
(A) খিলাফত আন্দোলন (Khilafat Movement)
কারণ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর ব্রিটিশ সরকার অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান তথা মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় প্রধান 'খলিফা'-র পদমর্যাদা বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেয়।
নেতৃত্ব: ⭐ আলী ভ্রাতৃদ্বয় — শওকত আলী ও মোহাম্মদ আলী (Ali Brothers), আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খান।
গান্ধীজির ভূমিকা: হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে গান্ধীজি খিলাফত কমিটিকে পূর্ণ সমর্থন জানান এবং ১৯১৯ সালে 'সর্বভারতীয় খিলাফত কনফারেন্স'-এর সভাপতি নির্বাচিত হন।
(B) অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা ও কর্মসূচি (Non-Cooperation Movement)
গৃহীত প্রস্তাব:
১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর: কলকাতার বিশেষ অধিবেশনে (সভাপতি: লালা লাজপত রায়) প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
⭐ ১৯২০ সালের ডিসেম্বর: নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে (সভাপতি: সি. বিজয়রাঘবাচারিয়ার) অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।
কর্মসূচি:
বর্জন (Boycott): সরকারি খেতাব ও পদবী ত্যাগ, সরকারি স্কুল-কলেজ, আদালত বর্জন, বিদেশী পণ্য ও বস্ত্র বর্জন।
গঠনমূলক কাজ (Constructive Work): জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপন (যেমন: জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, কাশী বিদ্যাপীঠ, গুজরাট বিদ্যাপীঠ), খাদি ও চরকার প্রচার, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ।
(C) আন্দোলনের গতিপথ ও তীব্রতা
আন্দোলন অভাবনীয় সাড়া পায়। হাজার হাজার ছাত্র স্কুল-কলেজ ছেড়ে দেয়, আইনজীবীরা (যেমন: দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহেরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ) ওকালতি বর্জন করেন।
১৯২১ সালের নভেম্বরে 'প্রিন্স অফ ওয়েলস' (Prince of Wales)-এর ভারত সফর বয়কট করা হয়।
(D) চৌরিচৌরা ঘটনা ও আন্দোলন প্রত্যাহার (Chauri Chaura Incident - 1922)
⭐ ঘটনা: ৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ সালে উত্তর প্রদেশের গোলক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা (Chauri Chaura) নামক স্থানে আন্দোলনকারীদের মিছিলের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলি চালালে জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে দিলে ২২ জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
আন্দোলন প্রত্যাহার: সহিংসতায় চরম মর্মাহত হয়ে মহাত্মা গান্ধী ১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ সালে গুজরাটের বারদোলিতে 'বারদোলি প্রস্তাব'-এর মাধ্যমে একক সিদ্ধান্তে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
প্রতিক্রিয়া: সুভাষচন্দ্র বসু একে "National Calamity" (জাতীয় বিপর্যয়) বলে অভিহিত করেন। জওহরলাল নেহেরু ও মতিলাল নেহেরুও এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এর পরপরই ১০ই মার্চ ১৯২২ গান্ধীজিকে ৬ বছরের জন্য গ্রেফতার করা হয়।
Table: গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের তালিকা
ঘটনা / বিষয় | সময়কাল | প্রধান ব্যক্তিত্ব | মূল ফলাফল / তাৎপর্য |
রাউলাট আইন | ১৮ মার্চ, ১৯১৯ | সিডনি রাউলাট, লর্ড চেমসফোর্ড | বিনা বিচারে আটক ("নো উকিল, নো আপিল") |
জালিয়ানওয়ালাবাগ | ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ | জেনারেল ডায়ার, সত্যপাল, কিচলু | ৩৭৯+ নিহত; রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড ত্যাগ |
খিলাফত আন্দোলন | ১৯১৯ - ১৯২৪ | শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী, গান্ধীজি | হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক |
অসহযোগ আন্দোলন | ১৯২০ - ১৯২২ | মহাত্মা গান্ধী, সি. আর. দাস, মতিলাল | ভারতের ১ম সর্বভারতীয় অহিংস গণআন্দোলন |
চৌরিচৌরা ঘটনা | ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ | স্থানীয় উত্তেজিত জনতা ও পুলিশ | ২২ জন পুলিশ নিহত; আন্দোলন প্রত্যাহার |
Important Facts (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য) ⭐
⭐ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সময় ভারতের ভাইসরয় কে ছিলেন? লর্ড চেমসফোর্ড (Lord Chelmsford)।
⭐ পাঞ্জাবের বিতর্কিত গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ারকে কে হত্যা করেছিলেন? উধম সিং (Udham Singh - ১৯৪০ সালে লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে)।
⭐ জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন উপাধি ত্যাগ করেন? নাইটহুড (Knighthood) উপাধি (১৯১৯)।
⭐ অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব কংগ্রেসের কোন অধিবেশনে গৃহীত হয়? ১৯২০ সালের নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে।
⭐ 'কায়সার-ই-হিন্দ' উপাধি কে ত্যাগ করেছিলেন? মহাত্মা গান্ধী (জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে)।
⭐ চৌরিচৌরা ঘটনাটি কোথায় এবং কবে ঘটেছিল? উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর জেলায়; ৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯২২।
⭐ "National Calamity" — অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারকে কে এই আখ্যা দিয়েছিলেন? সুভাষচন্দ্র বসু।
৮. Common Confusion (যে বিষয়গুলো পরীক্ষায় ভুল হয়)
ভুলধারণা 1: রেজিনাল্ড ডায়ার এবং মাইকেল ও'ডায়ার একই ব্যক্তি ছিলেন।
সঠিক তথ্য: রেজিনাল্ড ডায়ার (Reginald Dyer) ছিলেন অমৃতসরের মিলিটারির ব্রিগেডিয়ার যিনি গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছিলেন। আর মাইকেল ও'ডায়ার (Michael O'Dwyer) ছিলেন পাঞ্জাবের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, যাকে পরবর্তীতে উধম সিং হত্যা করেন।
ভুলধারণা 2: ১৯২০ সালের কলকাতা বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলন চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়।
সঠিক তথ্য: কলকাতা বিশেষ অধিবেশনে (সেপ্টেম্বর ১৯২০) প্রস্তাব পেশ ও খসড়া গৃহীত হয়, কিন্তু ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসের নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে আন্দোলনটি চূড়ান্ত অনুমোদন ও রূপরেখা পায়।
ভুলধারণা 3: চৌরিচৌরা ঘটনাটি বিহারে ঘটেছিল।
সঠিক তথ্য: চৌরিচৌরা উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর (Gorakhpur, UP) জেলায় অবস্থিত।
One Minute Revision (Quick Revision Notes)
রাউলাট আইন: মার্চ ১৯১৯ | বিনা বিচারে ২ বছর আটক | "নো উকিল, নো আপিল"।
জালিয়ানওয়ালাবাগ: ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ | অমৃতসর | জেনারেল ডায়ারের গুলি বর্ষণ | নাইটহুড ত্যাগ: রবীন্দ্রনাথ।
তদন্ত কমিটি: হান্টার কমিশন (১৯১৯)।
খিলাফত আন্দোলন: ১৯১৯ | নেতা: আলী ভ্রাতৃদ্বয় (শওকত ও মোহাম্মদ আলী)।
অসহযোগ আন্দোলন: ১৯২০–১৯২২ | নাগপুর অধিবেশন (১৯২০) থেকে সূচনা | ১ম অহিংস সর্বভারতীয় গণআন্দোলন।
চৌরিচৌরা ঘটনা: ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯২২ | গোরক্ষপুর, ইউপি | ২২ জন পুলিশকর্মী নিহত।
প্রত্যাহার: ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯২২ (বারদোলি প্রস্তাব)।
Chat with our faculty on WhatsApp for doubts, explanations, or to join our classes.
Chat on WhatsAppMore from Study Notes (Subject)
পরমাণু (ATOM) ,অণু (MOLECULE) ও যৌগ (COMPOUNDS)
ওয়াভেল প্ল্যান ও শিমলা সম্মেলন (Wavell Plan & Simla Conference - 1945)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ, ওয়াভেল প্ল্যান, ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৩ - ১৯৪৭)
আগস্ট অফার, ক্রিপস মিশন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪০ - ১৯৪২)

Near Vivekananda College More, Burdwan - 713103
রাউলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং অসহযোগ আন্দোলন (১৯১৯ - ১৯২২)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) পর ভারতীয়রা আশা করেছিল ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বায়ত্তশাসন বা রাজনৈতিক অধিকার দেবে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের দাবি পূরণের বদলে ১৯১৯ সালে দমনমূলক রাউলাট আইন পাস করে। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যার নৃশংসতম পরিণতি ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড।
এই চরম অন্যায় ও আস্থার সংকটের প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় গণআন্দোলন — অসহযোগ আন্দোলন (Non-Cooperation Movement) গড়ে তোলেন।
বিস্তারিত আলোচনা (Detailed Analysis)
রাউলাট আইন (Rowlatt Act - 1919)
(A) পটভূমি ও পাস
অফিসিয়াল নাম: Anarchical and Revolutionary Crimes Act of 1919।
কমিটি: স্যার সিডনি রাউলাট (Sir Sidney Rowlatt)-এর নেতৃত্বাধীন 'রাউলাট কমিটি' (Sedition Committee)-র সুপারিশে ১৯১৯ সালের ১৮ই মার্চ আইনটি পাস হয়।
(B) মূল বৈশিষ্ট্য ও কালো আইন
এই আইনের অধীনে পুলিশ কোনো পরোয়ানা ছাড়াই যে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করতে পারত এবং বিনা বিচারে ২ বছর পর্যন্ত আটক রাখতে পারত।
কোনো আইনজীবী নিয়োগ, আপিল বা যুক্তির সুযোগ ছিল না। তাই একে বলা হতো: "নো দলিল, নো উকিল, নো আপিল" (No Dalil, No Vakil, No Appeal)।
ভারতীয়রা এই আইনকে "কালো আইন" (Black Act) আখ্যা দেয়।
(C) প্রতিক্রিয়া
গান্ধীজি এই আইনের বিরুদ্ধে 'রাউলাট সত্যগ্রহ' (Rowlatt Satyagraha) আহ্বান জানান এবং ১৯১৯ সালের ৬ই এপ্রিল দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেন।
এটিই ছিল গান্ধীজির নেতৃত্বে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় ধর্মঘট/আন্দোলন।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (Jallianwala Bagh Massacre - 13th April 1919)
(A) পটভূমি
পাঞ্জাবের দুই প্রখ্যাত জনপ্রিয় নেতা ⭐ ড. সত্যপাল (Dr. Satyapal) এবং ড. সাইফুদ্দিন কিচলু (Dr. Saifuddin Kitchlew)-কে রাউলাট আইনের অধীনে গ্রেফতার করা হয়।
এর প্রতিবাদে এবং বৈশাখী উৎসব (Baisakhi Festival) উদযাপন করতে ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ মাঠে এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আয়োজিত হয়।
(B) নারকীয় হত্যাকাণ্ড
অমৃতসরের সামরিক প্রধান ⭐ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার (General Reginald Dyer) ওই মাঠে ঢোকার একমাত্র সংকীর্ণ পথটি অবরুদ্ধ করে দেন।
কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই নিরস্ত্র ও জনসমাবেশের ওপর টানা ১০ মিনিট ধরে ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। সরকারি হিসেবে ৩৭৯ জন এবং বেসরকারি হিসেবে ১,০০০-এর বেশি মানুষ শহীদ হন।
(দ্রষ্টব্য: তৎকালীন পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন মাইকেল ও'ডায়ার (Michael O'Dwyer), যাঁকে পরবর্তীকালে ১৯৪০ সালে লন্ডনে বিপ্লবী উধম সিং (Udham Singh) হত্যা করেন।)
(C) জাতীয় প্রতিক্রিয়া ⭐
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ব্রিটিশদের দেওয়া 'নাইটহুড' (Knighthood / Sir) উপাধি ত্যাগ করেন (মে ১৯১৯)।
মহাত্মা গান্ধী: তাঁর 'কায়সার-ই-হিন্দ' (Kaisar-i-Hind) স্বর্ণপদক ফিরিয়ে দেন।
শঙ্করন নায়ার (Shankaran Nair): ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন।
হান্টার কমিশন (Hunter Commission): হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের অক্টোবরে লর্ড হান্টারের নেতৃত্বে 'ডায়রিমারি কমিশন' বা হান্টার কমিশন গঠন করে (ভারতীয় সদস্য ছিলেন চিমনলাল সতালবাদ, পণ্ডিত জগৎ নারায়ণ, সুলতান আহমেদ)।
খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন (১৯১৯ - ১৯২২)
(A) খিলাফত আন্দোলন (Khilafat Movement)
কারণ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর ব্রিটিশ সরকার অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান তথা মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় প্রধান 'খলিফা'-র পদমর্যাদা বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেয়।
নেতৃত্ব: ⭐ আলী ভ্রাতৃদ্বয় — শওকত আলী ও মোহাম্মদ আলী (Ali Brothers), আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খান।
গান্ধীজির ভূমিকা: হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে গান্ধীজি খিলাফত কমিটিকে পূর্ণ সমর্থন জানান এবং ১৯১৯ সালে 'সর্বভারতীয় খিলাফত কনফারেন্স'-এর সভাপতি নির্বাচিত হন।
(B) অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা ও কর্মসূচি (Non-Cooperation Movement)
গৃহীত প্রস্তাব:
১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর: কলকাতার বিশেষ অধিবেশনে (সভাপতি: লালা লাজপত রায়) প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
⭐ ১৯২০ সালের ডিসেম্বর: নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে (সভাপতি: সি. বিজয়রাঘবাচারিয়ার) অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।
কর্মসূচি:
বর্জন (Boycott): সরকারি খেতাব ও পদবী ত্যাগ, সরকারি স্কুল-কলেজ, আদালত বর্জন, বিদেশী পণ্য ও বস্ত্র বর্জন।
গঠনমূলক কাজ (Constructive Work): জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপন (যেমন: জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, কাশী বিদ্যাপীঠ, গুজরাট বিদ্যাপীঠ), খাদি ও চরকার প্রচার, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ।
(C) আন্দোলনের গতিপথ ও তীব্রতা
আন্দোলন অভাবনীয় সাড়া পায়। হাজার হাজার ছাত্র স্কুল-কলেজ ছেড়ে দেয়, আইনজীবীরা (যেমন: দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহেরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ) ওকালতি বর্জন করেন।
১৯২১ সালের নভেম্বরে 'প্রিন্স অফ ওয়েলস' (Prince of Wales)-এর ভারত সফর বয়কট করা হয়।
(D) চৌরিচৌরা ঘটনা ও আন্দোলন প্রত্যাহার (Chauri Chaura Incident - 1922)
⭐ ঘটনা: ৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ সালে উত্তর প্রদেশের গোলক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা (Chauri Chaura) নামক স্থানে আন্দোলনকারীদের মিছিলের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলি চালালে জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে দিলে ২২ জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
আন্দোলন প্রত্যাহার: সহিংসতায় চরম মর্মাহত হয়ে মহাত্মা গান্ধী ১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ সালে গুজরাটের বারদোলিতে 'বারদোলি প্রস্তাব'-এর মাধ্যমে একক সিদ্ধান্তে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
প্রতিক্রিয়া: সুভাষচন্দ্র বসু একে "National Calamity" (জাতীয় বিপর্যয়) বলে অভিহিত করেন। জওহরলাল নেহেরু ও মতিলাল নেহেরুও এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এর পরপরই ১০ই মার্চ ১৯২২ গান্ধীজিকে ৬ বছরের জন্য গ্রেফতার করা হয়।
Table: গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের তালিকা
ঘটনা / বিষয় | সময়কাল | প্রধান ব্যক্তিত্ব | মূল ফলাফল / তাৎপর্য |
রাউলাট আইন | ১৮ মার্চ, ১৯১৯ | সিডনি রাউলাট, লর্ড চেমসফোর্ড | বিনা বিচারে আটক ("নো উকিল, নো আপিল") |
জালিয়ানওয়ালাবাগ | ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ | জেনারেল ডায়ার, সত্যপাল, কিচলু | ৩৭৯+ নিহত; রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড ত্যাগ |
খিলাফত আন্দোলন | ১৯১৯ - ১৯২৪ | শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী, গান্ধীজি | হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক |
অসহযোগ আন্দোলন | ১৯২০ - ১৯২২ | মহাত্মা গান্ধী, সি. আর. দাস, মতিলাল | ভারতের ১ম সর্বভারতীয় অহিংস গণআন্দোলন |
চৌরিচৌরা ঘটনা | ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ | স্থানীয় উত্তেজিত জনতা ও পুলিশ | ২২ জন পুলিশ নিহত; আন্দোলন প্রত্যাহার |
Important Facts (পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য) ⭐
⭐ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সময় ভারতের ভাইসরয় কে ছিলেন? লর্ড চেমসফোর্ড (Lord Chelmsford)।
⭐ পাঞ্জাবের বিতর্কিত গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ারকে কে হত্যা করেছিলেন? উধম সিং (Udham Singh - ১৯৪০ সালে লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে)।
⭐ জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন উপাধি ত্যাগ করেন? নাইটহুড (Knighthood) উপাধি (১৯১৯)।
⭐ অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব কংগ্রেসের কোন অধিবেশনে গৃহীত হয়? ১৯২০ সালের নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে।
⭐ 'কায়সার-ই-হিন্দ' উপাধি কে ত্যাগ করেছিলেন? মহাত্মা গান্ধী (জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে)।
⭐ চৌরিচৌরা ঘটনাটি কোথায় এবং কবে ঘটেছিল? উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর জেলায়; ৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯২২।
⭐ "National Calamity" — অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারকে কে এই আখ্যা দিয়েছিলেন? সুভাষচন্দ্র বসু।
৮. Common Confusion (যে বিষয়গুলো পরীক্ষায় ভুল হয়)
ভুলধারণা 1: রেজিনাল্ড ডায়ার এবং মাইকেল ও'ডায়ার একই ব্যক্তি ছিলেন।
সঠিক তথ্য: রেজিনাল্ড ডায়ার (Reginald Dyer) ছিলেন অমৃতসরের মিলিটারির ব্রিগেডিয়ার যিনি গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছিলেন। আর মাইকেল ও'ডায়ার (Michael O'Dwyer) ছিলেন পাঞ্জাবের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, যাকে পরবর্তীতে উধম সিং হত্যা করেন।
ভুলধারণা 2: ১৯২০ সালের কলকাতা বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলন চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়।
সঠিক তথ্য: কলকাতা বিশেষ অধিবেশনে (সেপ্টেম্বর ১৯২০) প্রস্তাব পেশ ও খসড়া গৃহীত হয়, কিন্তু ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসের নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে আন্দোলনটি চূড়ান্ত অনুমোদন ও রূপরেখা পায়।
ভুলধারণা 3: চৌরিচৌরা ঘটনাটি বিহারে ঘটেছিল।
সঠিক তথ্য: চৌরিচৌরা উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর (Gorakhpur, UP) জেলায় অবস্থিত।
One Minute Revision (Quick Revision Notes)
রাউলাট আইন: মার্চ ১৯১৯ | বিনা বিচারে ২ বছর আটক | "নো উকিল, নো আপিল"।
জালিয়ানওয়ালাবাগ: ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ | অমৃতসর | জেনারেল ডায়ারের গুলি বর্ষণ | নাইটহুড ত্যাগ: রবীন্দ্রনাথ।
তদন্ত কমিটি: হান্টার কমিশন (১৯১৯)।
খিলাফত আন্দোলন: ১৯১৯ | নেতা: আলী ভ্রাতৃদ্বয় (শওকত ও মোহাম্মদ আলী)।
অসহযোগ আন্দোলন: ১৯২০–১৯২২ | নাগপুর অধিবেশন (১৯২০) থেকে সূচনা | ১ম অহিংস সর্বভারতীয় গণআন্দোলন।
চৌরিচৌরা ঘটনা: ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯২২ | গোরক্ষপুর, ইউপি | ২২ জন পুলিশকর্মী নিহত।
প্রত্যাহার: ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯২২ (বারদোলি প্রস্তাব)।